বৈশ্বিক লিঙ্গ সমতা সূচকঃ ২০ বছরে বেড়েছিল ৮.৫ পয়েন্ট, এক বছরেই কমলো ৬.২; নারীর রাজনীতিতে ক্ষমতায়ন, অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ ও সুযোগ কমেছে

অথর
কুষ্টিয়া অনুসন্ধান নিউজ ডেক্স :   বাংলাদেশ
প্রকাশিত :5 October 2026, 7:42 AM | নিউজটি পড়া হয়েছে : 2 বার
বৈশ্বিক লিঙ্গ সমতা সূচকঃ ২০ বছরে বেড়েছিল ৮.৫ পয়েন্ট, এক বছরেই কমলো ৬.২; নারীর রাজনীতিতে ক্ষমতায়ন, অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ ও সুযোগ কমেছে

বিশ বছরে, ২০০৬ থেকে বৈশ্বিক লিঙ্গ সমতা সূচকে বাংলাদেশ এগিয়েছে ৮.৫ শতাংশ পয়েন্ট, কিন্তু গত এক বছরেই স্কোর কমেছে ৬.২ শতাংশ পয়েন্ট। ১৪৫টি অর্থনীতির সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান এখন ৭৯তম, লিঙ্গ ব্যবধান ঘুচেছে ৭১.২%।

অর্থাৎ দুই দশকের লিঙ্গ ব্যবধানে অগ্রগতির প্রায় ৭৩% এক বছরে মুছে গেছে।

২০১৯ থেকে বৈশ্বিক লিঙ্গসূচকের চিত্রঃ
২০১৯ থেকে ২০২৩ পর্যন্ত স্কোর ৭১–৭২%-এর মধ্যেই ছিল, অথচ র‍্যাংক ৫০ থেকে ৭১-এর মধ্যে ঘুরেছে। দেশের সংখ্যা আর অন্য দেশের স্কোর বদলালে র‍্যাংক সহজেই নড়ে। সবচেয়ে বড় ঝাকুনি গেছে ২০২৪ ও ২০২৫-এ। ২০২৪-এ ৯৯তম, পরের বছর ২৪তম, এরপর আবার ৭৯তম। অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন ২০২৪-এর পতনের আগের স্কোরটাই ২০২৫-এর লাফের পটভূমি।

বছর

র‍্যাংক

স্কোর

২০১৯

৫০

~৭২.৬%

২০২০

৫০

~৭২.৬%

২০২১

৬৫

৭১.৯%

২০২২

৭১

৭১.৪%

২০২৩

৫৯

৭২.২%

২০২৪

৯৯

৬৮.৯%

২০২৫

২৪

৭৭.৫%

২০২৬

৭৯

৭১.২%

র‍্যাংক ধারাবাহিকভাবে ওঠেনি। ২০২০ সালে ছিল ৫০তম, ২০২২-এ ৭১তম, আর ২০২৫-এ এক লাফে ৭৫ ধাপ উঠে ২৪তম। এবার সেখান থেকে বড় পতন। ২০০৬ ও ২০২৬ সালে দেশের সংখ্যা আলাদা (১১৫ ও ১৪৫), তাই র‍্যাংক সরাসরি তুলনীয় নয়, স্কোরই নির্ভরযোগ্য মাপকাঠি।

পতনের প্রধান কারণ রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন। প্রতিবেদন নিজেই বলছে, দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক স্কোর ১.৪ পয়েন্ট কমেছে মূলত বাংলাদেশের কারণে: ২০২৫ সালে সংসদ ভেঙে দেওয়ার পর গঠিত নতুন সংসদে নারীর আসন মাত্র ২.৪%।

রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন: ১২তম স্থান দাঁড়িয়ে আছে অতীতের ওপর
এই উপসূচকে বাংলাদেশ বিশ্বে ১২তম, ব্যবধান ঘুচেছে ৫০.৯%। কিন্তু এটি বর্তমান রাজনীতির প্রতিফলন নয়। তিনটি সূচক আলাদা করে দেখলে ছবিটা বোঝা যায়।

১. রাষ্ট্র/সরকারপ্রধান: পূর্ণ সমতা, কিন্তু অতীতের হিসাব। এই সূচক মাপা হয় গত ৫০ বছরে কত বছর নারী রাষ্ট্র বা সরকারপ্রধান ছিলেন তা দিয়ে। বিশ্বে এর গড় সমতা মাত্র ১৪.৪%। ১৪৫টির মধ্যে ৬৪টি অর্থনীতিতে এই সময়ে কোনো নারী রাষ্ট্রপ্রধান ছিলেন না, আর পূর্ণ সমতায় পৌঁছেছে কেবল বাংলাদেশ ও আইসল্যান্ড। ২০১৯ সাল থেকে বাংলাদেশ এই পূর্ণ স্কোর ধরে রেখেছে। এই স্কোরে বর্তমান সংসদ বা দলীয় কাঠামোতে নারীর অবস্থান প্রতিফলিত হয় না।

২. সংসদে নারীর অংশগ্রহণ: ২.৪%, সময়ের হিসাবে সর্বনিম্ন। বিশ্বে সংসদীয় সমতার গড় ৩২%। বিশ্বের মাঝের ৮০% অর্থনীতির স্কোর ১০.৮% থেকে ৭৬.৫%, বাংলাদেশ এখন সেই সীমারও অনেক নিচে। বলিভিয়া, কোস্টারিকা, মেক্সিকো, রুয়ান্ডা ও সংযুক্ত আরব আমিরাত এখানে পূর্ণ সমতায় পৌঁছেছে।

৩. মন্ত্রিসভা: ২০ বছরে ৯.১% থেকে ২৩.৫%। এটি অগ্রগতি, তবে প্রায় বৈশ্বিক গড়ের (২৩.৭%) সমান। অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, জার্মানি, স্পেন, সুইডেন ও যুক্তরাজ্যসহ ১২টি দেশ মন্ত্রিসভায় পূর্ণ সমতা অর্জন করেছে।

একটি সূচকে পূর্ণ নম্বর (ঐতিহাসিক), একটিতে বৈশ্বিক গড়ের সমান, আর একটিতে সর্বনিম্ন। র‍্যাংকিংয়ের “১২” আসলে অতীত কৃতিত্বের স্মারক। নারীরা এখন রাজনীতির মূল কাঠামোয় কতটা জায়গা পাচ্ছেন, তার উত্তর সংসদের ২.৪%।

অর্থনীতি: সবচেয়ে বড় ক্ষয়
অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ ও সুযোগে বাংলাদেশের অবস্থান সবচেয়ে দুর্বল, ব্যবধান ঘুচেছে ৪১.৯%।

এক বছরে সমতা কমেছে আনুমানিক উপার্জিত আয়ে ১৫, শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণে ৫.৭ এবং সিনিয়র নেতৃত্বে ১.৩ শতাংশ পয়েন্ট।
২০০৬-এর তুলনায় শ্রমশক্তিতে সমতা ৬১.১% থেকে ৪৮% (−১৩.১) এবং আয়ের সমতা ৫৪.৪% থেকে ৩৭.৫% (−১৬.৯)।
পেশাদার ও কারিগরি কাজে নারীর সমতা ৩৩.৩% থেকে ২৬.২%।
শিক্ষা: দুই দশকের সবচেয়ে উজ্জ্বল অর্জন
শিক্ষায় স্কোর ৯৬.১%, যা এ পর্যন্ত সর্বোচ্চ। মোট অগ্রগতি +৯.৩ পয়েন্ট। প্রাপ্তবয়স্ক সাক্ষরতায় +৩১.৭ ও উচ্চশিক্ষায় ভর্তিতে +২৭.৩ পয়েন্ট বেড়েছে। প্রাথমিক ও মাধ্যমিকে সমতা বজায় আছে, তবে উচ্চশিক্ষায় সমতা ৭৭.১%, যা সবচেয়ে বড় শিক্ষা-ব্যবধান। স্বাস্থ্য ও বেঁচে থাকায় স্কোর প্রায় অপরিবর্তিত, ৯৬.০%।

দক্ষিণ এশিয়ার তুলনা
দক্ষিণ এশিয়া ৬৪.৫% ব্যবধান ঘুচিয়ে আট অঞ্চলের মধ্যে ৭ম। ২০০৬ থেকে অঞ্চলটি এগিয়েছে ৪.৮ পয়েন্ট, এই গতিতে পূর্ণ সমতায় পৌঁছাতে লাগবে ১৪৯ বছর।

বাংলাদেশ ভারত পাকিস্তান
সামগ্রিক র‍্যাংক ৭৯তম ১৩১তম ১৪৩তম
সামগ্রিক স্কোর ৭১.২% ৬৪.৫% ৫৯.৫%
এক বছরে −৬.২ পয়েন্ট সামান্য বৃদ্ধি +২.৮ পয়েন্ট
২০০৬ থেকে +৮.৫ পয়েন্ট +৪.৩ পয়েন্ট +৫.২ পয়েন্ট
অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ ৪১.৯% ৪১.২% ৩৬.৪%
শিক্ষা ৯৬.১% ৯৬.৬% ৯১.৭%
রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন ৫০.৯% (১২তম) ২৪.৫% (৬৭তম) ১৪.১% (১০৭তম)
বাংলাদেশ সামগ্রিকভাবে ভারত ও পাকিস্তানের চেয়ে অনেক এগিয়ে, কিন্তু একমাত্র বাংলাদেশেরই স্কোর এত বড় আকারে কমেছে। অর্থনীতিতে পুরো অঞ্চলই পিছিয়ে (৪০.৯%, আট অঞ্চলের মধ্যে সর্বনিম্ন)। বাংলাদেশের ৪১.৯% আঞ্চলিক গড়ের সামান্য ওপরে।

রাজনীতিতে বাংলাদেশের ৫০.৯% ভারতের দ্বিগুণ, অথচ সংসদে ভারতের সমতা ১৬.১% আর বাংলাদেশের ২.৪%। সংসদের বিচারে বাংলাদেশ এখন দুই প্রতিবেশীর চেয়েও পিছিয়ে।

মালদ্বীপ এবার বিশ্বে সবচেয়ে বেশি স্কোর বাড়ানো দেশ (+৪.৪ পয়েন্ট)। ২০০৬ থেকে স্থায়ীভাবে সূচকে থাকা ৯৭টি অর্থনীতির মধ্যে একমাত্র শ্রীলঙ্কার স্কোর শুরুর অবস্থানের চেয়ে বাড়েনি।

দক্ষিণ এশিয়ার ভারত ও পাকিস্তানের তুলনায় বাংলাদেশ সামগ্রিকভাবে এখনো এগিয়ে,
কিন্তু একমাত্র বাংলাদেশেরই স্কোর এত বড় আকারে পড়েছে।

শিক্ষায় অর্জন আছে, কিন্তু তা শ্রমবাজার ও আয়ে রূপ নিচ্ছে না, উল্টো সেখানে ক্ষয় হচ্ছে। রাজনীতিতে সর্বোচ্চ পদে নারীর অতীত উপস্থিতি সূচকে উজ্জ্বল দেখালেও আইনসভায় নারী প্রায় অনুপস্থিত। দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশ এখনো এগিয়ে, কিন্তু এক বছরে দুই দশকের প্রায় তিন-চতুর্থাংশ অগ্রগতি হারানো দেখায়, অর্জনগুলো কতটা ভঙ্গুর। অতীতের কৃতিত্বে র‍্যাংকিং টিকিয়ে রাখা যাবে না; সংসদ ও শ্রমবাজারে কাঠামোগত পরিবর্তন লাগবে।

এই ব্যবধানই বাংলাদেশের সামনের মূল প্রশ্ন। র‍্যাংকিং ওঠানামা করে, কিন্তু সংসদের ২.৪% আর শ্রমবাজারের ক্ষয় কোনো পরিসংখ্যানগত বিচ্যুতি নয়, এগুলো নীতি ও কাঠামোর ফল। শিক্ষায় যে বিনিয়োগ দুই দশকে ফল দিয়েছে, রাজনীতি ও অর্থনীতিতেও নারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে ঠিক তেমন দীর্ঘমেয়াদি ও সুনির্দিষ্ট উদ্যোগ দরকার। না হলে অতীতের কৃতিত্বে র‍্যাংকিং ধরে রাখা যাবে না, আর দক্ষিণ এশিয়াকে পূর্ণ সমতায় পৌঁছাতে যে ১৪৯ বছরের হিসাব প্রতিবেদন কষেছে, তা আরও দূরে সরে যেতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

আরও পড়ুন