চব্বিশ থেকে ২৬: দারিদ্র্যের ঝুঁকিতে ৬ কোটি ২০ লাখ মানুষ, প্রবৃদ্ধি ৩.৪ শতাংশে স্থবির থাকার আশঙ্কা – বিশ্বব্যাংক
বাংলাদেশে জ্বালানি সংকট, ভঙ্গুর ব্যাংক খাত ও উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপে দারিদ্র্য আবার বাড়ছে বলে সতর্ক করেছে বিশ্বব্যাংক। সংস্থাটির হিসাবে, দারিদ্র্যসীমার ঠিক ওপরে থাকা প্রায় ৬ কোটি ২০ লাখ মানুষ যেকোনো ধাক্কায় নতুন করে দারিদ্র্যে পড়ার ঝুঁকিতে আছেন। মঙ্গলবার প্রকাশিত অক্টোবর ২০২৬-এর ‘বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট’-এ এ তথ্য উঠে এসেছে।
দারিদ্র্যের বর্তমান চিত্র
বিশ্বব্যাংক বলছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের ১০.১ শতাংশ মানুষ দৈনিক ৩ ডলারের আন্তর্জাতিক দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করেছেন। এক বছরে এই হার ১.১ শতাংশ পয়েন্ট বেড়েছে, ফলে নতুন করে প্রায় ২১ লাখ মানুষ দারিদ্র্যে পড়েছেন। জাতীয় দারিদ্র্যের হার ২০২২ সালের ১৮.৭ শতাংশ থেকে বেড়ে চলতি অর্থবছরে ২২.৫ শতাংশে উঠেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে তা আরও বেড়ে ২২.৮ শতাংশ হতে পারে।
নিম্ন আয়ের শ্রমিকদের প্রকৃত মজুরি এখনো কমছে। জ্বালানি ও সার ভর্তুকি এবং সামাজিক সুরক্ষায় সরকার বছরে জিডিপির প্রায় ৩.৫ শতাংশ, অর্থাৎ ১৭.৪ বিলিয়ন ডলার খরচ করে। কিন্তু সবচেয়ে গরিব এক-পঞ্চমাংশ পরিবারের ৬২ শতাংশ সুরক্ষা কর্মসূচির বাইরে, আর সবচেয়ে ধনী এক-পঞ্চমাংশের ১৮ শতাংশ তার আওতায় আছে।
প্রবৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি ও ব্যাংক খাত
বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ৩.৪ শতাংশে থমকে থাকবে। এটি এপ্রিলের পূর্বাভাসের চেয়ে কম এবং দশকের গড় ৫.৬ শতাংশের চেয়ে অনেক নিচে। গত অর্থবছরে শিল্প খাত বেড়েছে মাত্র ২ শতাংশ। মূল্যস্ফীতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরের ১০ শতাংশ থেকে কমে গত অর্থবছরে গড়ে ৮.৭ শতাংশ হয়েছে। চলতি অর্থবছরে সংস্থাটি ৮.৬ শতাংশ পূর্বাভাস দিয়েছে।
জুনে খেলাপি ঋণ মোট ঋণের ৩৩.২ শতাংশে পৌঁছেছে, যা ২০২৪ সালের শেষে ছিল ২০.২ শতাংশ। বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি নেমেছে ৩৩ বছরের সর্বনিম্ন ৪.৫ শতাংশে। রাজস্ব আয় জিডিপির ৮.৩ শতাংশ, আর রাজস্ব ঘাটতি ৩.৯ শতাংশ থেকে বেড়ে ৪.৮ শতাংশ হতে পারে।
পেছনে ফিরে দেখা: ২০২৪-এর আগের অর্থনীতি
বিশ্বব্যাংকের মূল্যায়নে ২০১০ থেকে ২০২২ সময়ে বাংলাদেশ দারিদ্র্য কমানোয় বড় সাফল্য দেখিয়েছে। এ সময়ে প্রায় ২ কোটি ২০ লাখ মানুষ দারিদ্র্য থেকে এবং ৯০ লাখ মানুষ চরম দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে এসেছেন। তাদের হিসাবে মাঝারি দারিদ্র্য ৩৭.১ শতাংশ থেকে ১৮.৭ শতাংশে এবং চরম দারিদ্র্য ১২.২ শতাংশ থেকে ৫.৬ শতাংশে নেমেছে। ২০২২ সালে দেশে দরিদ্র ছিলেন প্রায় ৩ কোটি ১০ লাখ, যাঁদের মধ্যে চরম দরিদ্র ৯৩ লাখ।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) খানা আয়-ব্যয় জরিপে (এইচআইইএস) দারিদ্র্যের হার ২০১৬ সালের ২৪.৩ শতাংশ থেকে ২০২২ সালে ১৮.৭ শতাংশে নেমেছে। চরম দারিদ্র্য ১২.৯ শতাংশ থেকে ৫.৬ শতাংশে কমেছে। ২০২২ সালে গ্রামাঞ্চলে দারিদ্র্যের হার ছিল ২০.৫ ও শহরে ১৪.৭ শতাংশ। একই সময়ে বৈষম্য বেড়েছে, গিনি সহগ ০.৪৮২ থেকে ০.৪৯৯ হয়েছে। মাথাপিছু খানা আয় ১৫,৯৮৮ থেকে বেড়ে ৩৩,৪২২ টাকা হয়েছে।
তবে বিশ্বব্যাংক বলছে, ২০১৬ সালের পর থেকে দারিদ্র্য কমার গতি কমে গিয়েছিল। প্রবৃদ্ধি ১ শতাংশ বাড়লে বাংলাদেশে দারিদ্র্য কমেছে ০.৯ শতাংশ, যেখানে দক্ষিণ এশিয়ার গড় ১.৫ শতাংশ।
প্রবৃদ্ধির দিক থেকেও ২০২২-২৩ অর্থবছরের আগের চিত্র ভিন্ন ছিল। বিবিএস ও বিশ্বব্যাংকের তথ্যে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ছিল এমন:
অর্থবছর প্রবৃদ্ধি
২০১৮-১৯ ৭.৯%
২০১৯-২০ (কোভিড) ৩.৪%
২০২০-২১ ৬.৯%
২০২১-২২ ৭.১%
২০২২-২৩ ৫.৮%
২০২৩-২৪ ৪.২%
২০২৪-২৫ ৩.৫%
অর্থাৎ ২০২২-২৩ থেকে টানা তিন বছর প্রবৃদ্ধি কমেছে। ওই সময় ব্যাপক মূল্যস্ফীতি, উচ্চ সুদ ও দুর্বল চাহিদায় বিনিয়োগ কমেছে। ২০২২ সালে জিডিপির আকার ছিল প্রায় ৪৬০ বিলিয়ন ডলার, যা ২০২৩-২৪ অর্থবছরে প্রায় ৪৫০ বিলিয়ন ডলারে নেমে আসে। মাথাপিছু আয় টানা দুই বছর কমার পর ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সামান্য বেড়ে ২,৭৬৯ ডলার হয়েছে।
মূল্যস্ফীতি ২০২১-২২ অর্থবছরে গড়ে ছিল ৬.১৫ শতাংশ। ২০২২-২৩ অর্থবছরে তা দশকের সর্বোচ্চ ৯.০২ শতাংশে ওঠে, অথচ বাজেটে লক্ষ্য ছিল ৫.৬ শতাংশ। ২০২৩ সালের আগস্টে মূল্যস্ফীতি ৯.৯২ ও খাদ্যমূল্যস্ফীতি ১২.৫৪ শতাংশে পৌঁছায়। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ২০২১ সালের ডিসেম্বরের প্রায় ৪৬ বিলিয়ন ডলার থেকে কমে ২০২৩ সালের জুনে প্রায় ৩০ বিলিয়ন ডলারে নামে। এটি ছিল পাঁচ বছরে সর্বনিম্ন। ২০২২-২৩ অর্থবছরে রেমিট্যান্স বেড়েছে মাত্র ২.৭ শতাংশ।
এডিবির প্রতিবেদনেও একই ধারা
এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) সেপ্টেম্বরের ‘এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট আউটলুক’-এ প্রবৃদ্ধি ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৩.৫ শতাংশ, ২০২৫-২৬-এ ৩.৭ শতাংশ এবং ২০২৬-২৭-এ ৪ শতাংশ প্রাক্কলন করা হয়েছে। এর আগে এপ্রিলে ২০২৬-২৭-এর পূর্বাভাস ছিল ৪.৭ এবং জুলাইয়ে ৪.৫ শতাংশ, অর্থাৎ ধাপে ধাপে কমানো হয়েছে।
এডিবির হিসাবে মূল্যস্ফীতি চলতি অর্থবছরে ৯ শতাংশে উঠতে পারে, জ্বালানি সংকট, উৎপাদন ও পরিবহন খরচ এবং এল নিনোর কারণে। চলতি হিসাবের ঘাটতি জিডিপির ০.৩ শতাংশ থেকে বেড়ে ০.৬ শতাংশ হতে পারে। প্রবৃদ্ধির চালিকাশক্তি হবে সেবা, কৃষি ও রেমিট্যান্স-নির্ভর ভোগ। শিল্প ও বিনিয়োগ চাপে থাকবে উচ্চ সুদ, ঋণপ্রাপ্তির সংকট, জ্বালানি ঘাটতি ও বিদেশি চাহিদা কমে যাওয়ায়। এডিবির কান্ট্রি ডিরেক্টর কিংফেং ঝাং বলেন, অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করলেও ঝুঁকি কাটেনি। তিনি সামষ্টিক অর্থনীতি ব্যবস্থাপনা, আর্থিক খাত, জ্বালানি নিরাপত্তা ও ব্যবসার পরিবেশে সংস্কার দ্রুত করার আহ্বান জানান।
স্বস্তির জায়গা
রেমিট্যান্স ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ১৭.৩ শতাংশ বেড়ে রেকর্ড ৩৫.৬ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। আগস্টে রিজার্ভ ৩২ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। তবে সামগ্রিক রপ্তানি ০.২ শতাংশ কমেছে। বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস, ২০২৭-২৮ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ৩.৯ শতাংশে উঠতে পারে, তবে তা বৈশ্বিক পণ্যবাজার স্থিতিশীল হওয়া, জ্বালানি সংকট কমা ও কাঠামোগত সংস্কারের ওপর নির্ভরশীল।























