সৌদি আরবে নিরাপত্তাঝুঁকি, রেমিট্যান্স প্রবাহে নতুন শঙ্কা

অথর
কুষ্টিয়া অনুসন্ধান নিউজ ডেক্স :   বাংলাদেশ
প্রকাশিত :16 October 2026, 9:05 PM | নিউজটি পড়া হয়েছে : 8 বার
সৌদি আরবে নিরাপত্তাঝুঁকি, রেমিট্যান্স প্রবাহে নতুন শঙ্কা

দেশের মোট প্রবাসী আয়ের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ আসে সৌদি আরব থেকে। মধ্যপ্রাচ্যের ১৩ দেশ থেকে আসে মোট রেমিট্যান্সের ৪৭.৪৫ শতাংশ। সংকট দীর্ঘ হলে জনশক্তি রপ্তানি ও প্রবাসী আয়ের প্রবাহে অনিশ্চয়তা বাড়তে পারে।

বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার অন্যতম প্রধান উৎস প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স। সাম্প্রতিক সময়ে এ আয়ের প্রবাহে ইতিবাচক ধারা থাকলেও মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।

বিশেষ করে সৌদি আরবকে ঘিরে নিরাপত্তাঝুঁকি বাড়লে তার প্রভাব পড়তে পারে দেশের প্রবাসী আয়ের ওপর। কারণ, বাংলাদেশের রেমিট্যান্সের সবচেয়ে বড় একক উৎস সৌদি আরব।

দেশটিতে কর্মরত প্রায় ৩৫ লাখ বাংলাদেশির কর্মসংস্থান, নিরাপত্তা ও অর্থ পাঠানোর সক্ষমতার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহের একটি বড় অংশ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশে প্রবাসী আয় এসেছে ৮৫৯ কোটি ডলার। এর মধ্যে সৌদি আরব থেকে এসেছে ১৬৫ কোটি ডলার, যা মোট প্রবাসী আয়ের ১৯ দশমিক ২ শতাংশ।

গত অর্থবছরের একই সময়ে দেশটি থেকে এসেছিল প্রায় ১২৩ কোটি ডলার। সে হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে সৌদি আরব থেকে প্রবাসী আয় বেড়েছে প্রায় ৩৪ শতাংশ।

অর্থাৎ, সাম্প্রতিক সময়ে রেমিট্যান্স প্রবাহে সৌদি আরবের অবদান আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ফলে দেশটিতে নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি, কর্মসংস্থানে বিঘ্ন কিংবা আন্তর্জাতিক যোগাযোগব্যবস্থায় দীর্ঘস্থায়ী প্রতিবন্ধকতা তৈরি হলে বাংলাদেশের প্রবাসী আয়ের প্রবৃদ্ধিও চাপে পড়তে পারে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, মধ্যপ্রাচ্যের ১৩টি দেশ থেকে দেশের মোট প্রবাসী আয়ের ৪৭ দশমিক ৪৫ শতাংশ আসে। দেশগুলো হলো সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত, বাহরাইন, ওমান, ইয়েমেন, ইরাক, ইরান, জর্ডান, লেবানন, সিরিয়া ও তুরস্ক।

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংকটে সৌদি আরবও ঝুঁকিমুক্ত নয়

এর মধ্যে উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদভুক্ত (জিসিসি) ছয় দেশ—সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত, বাহরাইন ও ওমান থেকে আসে মোট প্রবাসী আয়ের ৪৬ দশমিক ২৭ শতাংশ।

এ পরিসংখ্যান বাংলাদেশের রেমিট্যান্স প্রবাহের সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজার ও নিরাপত্তা পরিস্থিতির গভীর সম্পর্ক তুলে ধরে। এ অঞ্চলে সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে কর্মীদের চলাচল, নতুন কর্মী নিয়োগ এবং বিদ্যমান কর্মসংস্থানের ওপর প্রভাব পড়তে পারে।

তবে নিরাপত্তাঝুঁকি থেকে রেমিট্যান্স কমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকলেও এর প্রকৃত মাত্রা নির্ভর করবে পরিস্থিতির স্থায়িত্ব, কর্মসংস্থানের অবস্থা এবং অর্থ পাঠানোর ব্যবস্থার ওপর।

রেমিট্যান্সের বড় উৎস সৌদি আরব
সৌদি আরব থেকে প্রবাসী আয় বৃদ্ধির ধারাটি বাংলাদেশের জন্য ইতিবাচক। গত অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে দেশটি থেকে প্রায় ১২৩ কোটি ডলার এলেও চলতি অর্থবছরের একই সময়ে এসেছে ১৬৫ কোটি ডলার। এতে দেশের রেমিট্যান্স প্রবাহে সৌদি আরবের ওপর নির্ভরতার গুরুত্ব আরও স্পষ্ট হয়েছে।

তবে এ প্রবৃদ্ধি অব্যাহত থাকবে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি ঘিরে। ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহী গোষ্ঠীর সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে হামলার ঘটনায় নিরাপত্তা উদ্বেগ বাড়ার পাশাপাশি বিমান চলাচলে বিঘ্নের বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে।

পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে সৌদি আরবে যাতায়াতকারী কর্মীদের ভোগান্তি বাড়তে পারে। একই সঙ্গে নতুন কর্মী পাঠানো ও জনশক্তি রপ্তানির কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মুস্তফা কে মুজেরী বলেন, বর্তমানে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির সূচকগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ইতিবাচক অবস্থায় রয়েছে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স। সৌদি আরব এ আয়ের বড় উৎস। দেশটিতে কোনো ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হলে প্রবাসী আয় তথা দেশের অর্থনীতিতে বিরূপ প্রভাব পড়বেই।

তিনি বলেন, পরিস্থিতি কীভাবে মোকাবিলা করা যায়, সে বিষয়ে সরকারকে এখনই কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। একই সঙ্গে প্রবাসী আয়ের নতুন নতুন উৎস দেশ খুঁজে বের করতে হবে।

প্রণোদনা বাড়ানোর পরিকল্পনা
প্রবাসী আয় বাড়াতে সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিগত সহায়তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বর্তমানে বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলে অর্থ পাঠালে প্রবাসীরা ২ দশমিক ৫ শতাংশ নগদ প্রণোদনা পান।

এর উদ্দেশ্য হলো, প্রবাসীদের বৈধ পথে অর্থ পাঠাতে উৎসাহিত করা এবং আনুষ্ঠানিক চ্যানেলে রেমিট্যান্সের প্রবাহ বাড়ানো।

তবে প্রণোদনার হার বাড়িয়ে এ প্রবাহ কতটা দীর্ঘমেয়াদে ধরে রাখা যাবে, সে প্রশ্নও রয়েছে।

গত মঙ্গলবার এক অনুষ্ঠানে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হক জানিয়েছেন, রেমিট্যান্সের প্রবাহ বাড়াতে মধ্যপ্রাচ্যসহ কয়েকটি দেশে প্রবাসী কার্ড চালুর পরীক্ষামূলক কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এ কার্ডের মাধ্যমে বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা ও আর্থিক লেনদেনের ব্যবস্থা থাকবে। বৈধ পথে রেমিট্যান্স পাঠালে ৩ শতাংশ প্রণোদনা দেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে সরকারের।

সরকারের এ উদ্যোগ প্রবাসীদের আনুষ্ঠানিক মাধ্যমে অর্থ পাঠাতে উৎসাহিত করতে পারে। তবে মধ্যপ্রাচ্যে নিরাপত্তাঝুঁকি দীর্ঘস্থায়ী হলে শুধু প্রণোদনা দিয়ে রেমিট্যান্সের প্রবাহ সুরক্ষিত রাখা কঠিন হতে পারে।

কারণ, প্রবাসী আয়ের পরিমাণ নির্ভর করে বিদেশে কর্মসংস্থান, কর্মীদের আয়, চাকরির স্থায়িত্ব এবং অর্থ দেশে পাঠানোর সুযোগের ওপরও।

অর্থনীতিবিদদের মতে, রেমিট্যান্সের প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে বৈধ পথে অর্থ পাঠানোর প্রক্রিয়া সহজ করা, বিনিময় হারে স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং প্রবাসীদের জন্য আর্থিক সেবার সুযোগ বাড়ানো জরুরি। একই সঙ্গে বিদেশগামী কর্মীদের দক্ষতা উন্নয়ন ও নতুন শ্রমবাজার তৈরিতে জোর দিতে হবে।

সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো বাংলাদেশের জনশক্তি রপ্তানি ও প্রবাসী আয়ের প্রধান গন্তব্য। ফলে এ অঞ্চলের অস্থিরতা দেশের অর্থনীতিতে কী প্রভাব ফেলতে পারে, তা বিবেচনায় নিয়ে আগাম প্রস্তুতি নেওয়া প্রয়োজন।

নতুন শ্রমবাজার সৃষ্টি, কর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং রেমিট্যান্সের উৎসে বৈচিত্র্য আনার উদ্যোগ না থাকলে একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের সংকট দেশের বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহকে ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন