মেঘালয়ে ফেরার পথ বন্ধ, গারো পাহাড়ে অনিশ্চয়তায় ১৫০ হাতি

অথর
কুষ্টিয়া অনুসন্ধান নিউজ ডেক্স :   বাংলাদেশ
প্রকাশিত :19 October 2026, 6:35 AM | নিউজটি পড়া হয়েছে : 4 বার
মেঘালয়ে ফেরার পথ বন্ধ, গারো পাহাড়ে অনিশ্চয়তায় ১৫০ হাতি

শেরপুর ও জামালপুরের গারো পাহাড় এলাকায় প্রায় ১৫০টি বন্যহাতি বিচরণ করছে। বন বিভাগ জানিয়েছে, ভারতের মেঘালয় থেকে আসা হাতিগুলো গত দুই বছর ধরে নিজ আবাসস্থলে ফিরতে পারছে না।

ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের কাঁটাতারের বেড়া থাকা গেটগুলো বন্ধ থাকায় হাতির স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। এতে হাতির খাদ্যসংকটের পাশাপাশি ফসল ও বসতবাড়ির ক্ষতি এবং মানুষ-হাতির সংঘাতের ঝুঁকি বাড়ছে।

বন বিভাগের কর্মকর্তাদের বরাতে জানা গেছে, হাতিগুলো কয়েকটি দলে বিভক্ত হয়ে শেরপুর ও জামালপুরের প্রায় ১২ হাজার হেক্টর বনাঞ্চল ও আশপাশের এলাকায় বিচরণ করছে। দলগুলোতে ২৫ থেকে ৩০টি শাবকও রয়েছে। পর্যাপ্ত খাবার না পেয়ে হাতিরা প্রায়ই লোকালয় ও কৃষিজমিতে ঢুকে পড়ছে। এতে কৃষকের ফসল নষ্ট হচ্ছে, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বসতবাড়ি, বাড়ছে দুর্ঘটনার আশঙ্কা।

সীমান্তের বেড়ায় বাধাগ্রস্ত চলাচল
বন বিভাগের কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, ২০০০ সালের দিকে মেঘালয় থেকে ১০ থেকে ১৫টি বন্যহাতি বাংলাদেশের গারো পাহাড় এলাকায় আসে। পরে বংশবিস্তারের ফলে হাতির সংখ্যা বেড়েছে। একসময় হাতির দল নিয়মিত বাংলাদেশ ও ভারতের সীমান্তবর্তী বনাঞ্চলের মধ্যে চলাচল করত। এরপর ২০০৭ সালে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে মেঘালয় রাজ্যের সঙ্গে শেরপুর ও জামালপুরের সীমান্ত এলাকায় প্রায় ৫০ কিলোমিটার কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ করা হয়। হাতির চলাচল সহজ করতে সেখানে ৪৪টি গেট ও নদী-ছড়ার ওপর ১১টি আন্ডারপাস নির্মাণ করা হয়েছিল। তবে গেটগুলো বন্ধ থাকায় হাতিরা স্বাভাবিক পথে ভারতে ফিরতে পারছে না।

বন বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সীমান্তের গেট খুলে দেওয়ার জন্য ভারতীয় কর্তৃপক্ষের কাছে একাধিকবার অনুরোধ জানানো হয়েছে। কিন্তু এখনো প্রত্যাশিত সাড়া পাওয়া যায়নি।

ফসলের ক্ষতি, বাড়ছে দুর্ঘটনার ঝুঁকি
হাতির আবাসস্থলে পর্যাপ্ত খাবার না থাকলে তারা খাদ্যের সন্ধানে কৃষিজমি ও লোকালয়ে প্রবেশ করে। এতে স্থানীয় কৃষকেরা আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন। অন্যদিকে হাতির উপস্থিতিতে আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন সীমান্তবর্তী গ্রামের বাসিন্দারা।

নালিতাবাড়ী উপজেলার পানিহাটা এলাকার কৃষক যোসেফ মারাক বলেন, এমন কোনো বছর নেই, যে বছর হাতি এসে ফসলের ক্ষতি করে না। বছরের পর বছর ফসলের ক্ষতি হওয়ায় ঠিকমতো ঘরে ধান তুলতে পারি না। সারা বছরের পরিশ্রমের ফসল হাতি নষ্ট করে দেওয়ায় পরিবার নিয়ে দুশ্চিন্তায় থাকতে হয়।

পানিহাটা এলাকার অপর কিষানি আশালতা বলেন, ধান পাকার সময় এলেই হাতির আতঙ্কে থাকতে হয়। কখন হাতির পাল এসে জমির ফসল নষ্ট করে, সেই দুশ্চিন্তায় রাতের ঘুম হারাম হয়ে যায়। ফসল রক্ষায় রাত জেগে পাহারা দিয়েও শেষ পর্যন্ত সব ফসল বাঁচানো সম্ভব হয় না।

বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ ও ২০২৫-২৬ অর্থবছরে শেরপুরে মানুষ-হাতির সংঘাতের ঘটনায় প্রায় ৪৩৫ হেক্টর জমির ফসল নষ্ট হয়েছে। এ সময়ে হাতির সঙ্গে সংঘাতে ১০ জন মানুষ ও চারটি বন্যহাতি মারা গেছে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই ক্ষয়ক্ষতির পেছনে শুধু হাতির লোকালয়ে প্রবেশকে দায়ী করলে সমস্যার মূল কারণ আড়ালে থেকে যায়। হাতির চলাচলের পথ সংকুচিত হওয়া, বনাঞ্চলে খাদ্যের প্রাপ্যতা এবং মানুষের কৃষি ও বসতি সম্প্রসারণ—এসব বিষয়ও গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

আন্তঃসীমান্ত উদ্যোগের অপেক্ষা
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক এম এ আজিজের মতে, হাতির স্বাভাবিক চলাচলের পথ বাধাগ্রস্ত হলে মানুষ-হাতির সংঘাত বাড়তে পারে। এ সমস্যা সমাধানে বাংলাদেশ ও ভারতের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

তিনি বলেন, দুই দেশের মধ্যে আন্তঃসীমান্ত হাতি সংরক্ষণে ২০২০ সালের ডিসেম্বরে একটি প্রটোকল স্বাক্ষরিত হয়। কিন্তু এরপর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও এ উদ্যোগের উল্লেখযোগ্য কোনো কার্যকর অগ্রগতি দেখা যায়নি।

এদিকে, গত ১০ অক্টোবর শেরপুরের নালিতাবাড়ীর মধুটিলা ইকোপার্কে মানুষ-হাতির সংঘাত নিরসন ও বন্যহাতি সংরক্ষণবিষয়ক এক আলোচনায় পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু জানিয়েছিলেন, বিদ্যমান প্রটোকলের আওতায় ভারতের সঙ্গে আলোচনা শুরু করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। হাতির চলাচলের সুবিধার্থে সীমান্তের গেট খুলে দেওয়ার জন্য ভারতীয় কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ জানানো হবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

মন্ত্রী আরও বলেন, শেরপুরের বনাঞ্চলকে হাতির নিরাপদ আবাসস্থল হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হবে। একই সঙ্গে গারো পাহাড়ের প্রাকৃতিক পরিবেশ ও বন্যহাতিকে কেন্দ্র করে পর্যটনের সম্ভাবনা কাজে লাগানোর পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি।

সংবাদটি শেয়ার করুন

আরও পড়ুন