জেলেনস্কির সাবেক প্রেস সচিবের দাবি: “আমি রুশ গুপ্তচর নই, শুধু চাই ইউক্রেন আত্মসমর্পণ করুক”

অথর
কুষ্টিয়া অনুসন্ধান নিউজ ডেক্স :   বাংলাদেশ
প্রকাশিত :18 October 2026, 7:02 PM | নিউজটি পড়া হয়েছে : 1 বার
জেলেনস্কির সাবেক প্রেস সচিবের দাবি: “আমি রুশ গুপ্তচর নই, শুধু চাই ইউক্রেন আত্মসমর্পণ করুক”

ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সাবেক প্রেস সচিব ইউলিয়া মেন্ডেল দ্য টেলিগ্রাফকে বলেছেন, তিনি রাশিয়ার চর নন। তাঁর অবস্থান হলো, যুদ্ধে জেতা সম্ভব নয় এবং কিয়েভের আত্মসমর্পণ করা উচিত। একসময় জেলেনস্কির প্রশংসায় বই লেখা এই নারী এখন তাঁকে “শান্তির পথে সবচেয়ে বড় বাধা” বলছেন এবং পদত্যাগের দাবি তুলছেন।

প্রশংসা থেকে তীব্র সমালোচনা
দুই বছর জেলেনস্কির ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে কাজ করেছেন মেন্ডেল। ২০২২ সালে প্রকাশিত তাঁর বই দ্য ফাইট ফর আওয়ার লাইভস-এ তিনি জেলেনস্কিকে “এক ঝলক টাটকা বাতাস” বলে বর্ণনা করেছিলেন। রাশিয়ার উদ্দেশ্য ছিল “ইউক্রেনকে মানচিত্র থেকে মুছে ফেলা”, এমনও লিখেছিলেন তিনি। এখন তিনি জেলেনস্কির যুদ্ধ-কৌশলকে “জাতীয় আত্মহত্যা” আখ্যা দিচ্ছেন এবং সতর্ক করছেন, এতে ইউক্রেন “আফগানিস্তানের পথে” যেতে পারে। তাঁর ভাষ্য, “যুদ্ধের পরিস্থিতি বদলেছে, যুদ্ধের পরিণতিও বদলেছে।”

দায় নিয়ে মন্তব্য
সাক্ষাৎকারে মেন্ডেল স্বীকার করেন, যুদ্ধ শুরু করেছেন ভ্লাদিমির পুতিনই। তবু তাঁর সমালোচনার প্রায় পুরোটাই ছিল জেলেনস্কিকে ঘিরে। তিনি প্রথমে বলেন, যুদ্ধের দায় পুতিন ও জেলেনস্কির সমান। পরে সংশোধন করে বলেন, “হয়তো ৬০-৪০, পুতিন ৬০ শতাংশ, জেলেনস্কি ৪০ শতাংশ।” যুদ্ধের জন্য ইউক্রেন ও তার নেতাদের দায়ী করা ক্রেমলিনের অপপ্রচারের একটি পরিচিত অংশ, যার লক্ষ্য কিয়েভের প্রতি পশ্চিমা সমর্থন দুর্বল করা।

জেলেনস্কিকে ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো “স্বৈরশাসক” বলার কথাও তিনি আংশিক প্রত্যাহার করেন। এখন তিনি “স্বেচ্ছাচারী” শব্দটি ব্যবহার করছেন। তিনি বলেন, “হয়তো আমি একটু বেশি কড়া হয়ে গিয়েছিলাম, তবে সমস্যা হলো দেশে আর গণতন্ত্র নেই।” যুদ্ধকালে নির্বাচন না করায় তিনি জেলেনস্কির কড়া সমালোচনা করেন। যদিও ২০২২ সালে রাশিয়ার আগ্রাসনের পর জারি হওয়া সামরিক আইনের অধীনে ইউক্রেনের সংবিধান নির্বাচন নিষিদ্ধ করে।

এ প্রসঙ্গে আরও উল্লেখ্য, ২০২৫ সালের শুরু থেকে জেলেনস্কি বারবার যুদ্ধবিরতি ও পুতিনের সঙ্গে আলোচনার প্রস্তাব দিয়েছেন। কিন্তু সেগুলো প্রত্যাখ্যাত হয়েছে, অথবা বিনিময়ে চরম ভূখণ্ডগত ছাড়ের দাবি তোলা হয়েছে। পুতিন এখনো পূর্বাঞ্চলীয় দনবাস পুরোটা এবং রাশিয়ার আংশিক নিয়ন্ত্রণাধীন অন্যান্য ভূখণ্ড ছেড়ে দিতে ইউক্রেনকে চাপ দিচ্ছেন। যুদ্ধ-পরবর্তী সীমান্ত রক্ষায় ন্যাটো সেনা মোতায়েনের সম্ভাবনাও তিনি নাকচ করেছেন। মেন্ডেলের বক্তব্যে এসব বিষয়ের উল্লেখ নেই।

মেন্ডেল জেলেনস্কির ঘনিষ্ঠতম সহযোগীদের একজন থেকে তাঁর অন্যতম কঠোর সমালোচকে পরিণত হয়েছেন। ছবি: পাবলো ইউরকিন

রুশ এজেন্ট সন্দেহ ও নিষেধাজ্ঞা
মেন্ডেলের মত পরিবর্তন এবং তাঁর কিছু দাবি, যেগুলোর কোনোটি প্রতিশোধমূলক, কোনোটি একেবারেই অবিশ্বাস্য, ইউক্রেনীয় কর্মকর্তা ও বিরোধী সংসদ সদস্যদের মধ্যে সন্দেহ তৈরি করেছে যে তিনি রুশ এজেন্ট। তিনি এটিকে “হাস্যকর” বলে উড়িয়ে দিয়ে বলেন, “রাশিয়ার সঙ্গে আমার কোনো সম্পর্ক নেই।”

তাঁর সামাজিক মাধ্যম ও সাম্প্রতিক সাক্ষাৎকারে জেলেনস্কির মাদক সেবন, যুদ্ধকে পুঁজি করে অবৈধ মুনাফা এবং তাঁর সাবেক চিফ অব স্টাফের “শয়তানি জাদুবিদ্যায়” জড়িত থাকার মতো প্রমাণহীন অভিযোগ ছড়ানো হয়েছে। জেলেনস্কি মাদকের অভিযোগ কঠোরভাবে অস্বীকার করেছেন। ইউক্রেনের সমালোচকদের অভিযোগ, তিনি যুক্তরাষ্ট্রের মাগা আন্দোলন ও জার্মানির অল্টারনেটিভ ফর ডয়চল্যান্ড (এএফডি) সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কাজ করে ইউক্রেনের প্রতি মার্কিন ও ইউরোপীয় সামরিক ও আর্থিক সহায়তা দুর্বল করার চেষ্টা করছেন। যুক্তরাষ্ট্রের ডানপন্থী প্রান্তিক প্রভাবশালী ও জার্মানির চরম ডানপন্থীদের সঙ্গেও তিনি যোগাযোগ বাড়াচ্ছেন, যাদের অনেকে ক্রেমলিনপন্থী বক্তব্য দেন।

সেপ্টেম্বরে “অপতথ্য ও রুশ প্রোপাগান্ডা” ছড়ানো এবং “ইউক্রেনের বিরুদ্ধে রাশিয়ার আগ্রাসী নীতিকে সমর্থনের” অভিযোগে মেন্ডেলের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন জেলেনস্কি। ৪০ বছর বয়সী মেন্ডেল বলেন, তিনি এরপর রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগ আসতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন, তবে আইনি পথে লড়বেন। তাঁর অভিযোগ, যাঁকে তিনি “অনুগত নন বা সমালোচক” মনে করেন, তাঁকেই জেলেনস্কি চুপ করিয়ে দিতে চান।

পশ্চিমা নেতাদের সমালোচনা, এএফডির প্রশংসা
মেন্ডেল পশ্চিমা নেতাদের সমালোচনা করে বলেছেন, তাঁরা পুতিনের সঙ্গে আলোচনায় বসছেন না। বার্লিনের সঙ্গে মস্কোর সম্পর্ক নতুন করে শুরু করার এএফডির যে ইচ্ছা, তার তিনি প্রশংসা করেছেন। জনতুষ্টিবাদী ও রুশপন্থী এই দলটির প্রতি তিনি সরাসরি সমর্থন জানাননি, তবে বলেছেন শান্তি প্রচেষ্টায় দলটির ভূমিকা থাকা উচিত। তাঁর ভাষ্য, “[ফ্রিডরিখ] মের্ৎস পুতিনের সঙ্গে কথা বলেন না… এএফডি পুতিনের সঙ্গে কথা বলতে চায়।”

সেপ্টেম্বরে স্ট্রাসবুর্গে ইউরোপীয় পার্লামেন্টে এএফডি আয়োজিত “শান্তির সাহস করুন: কূটনীতি, উত্তেজনা বৃদ্ধি নয়” শীর্ষক অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেওয়ার কথা ছিল মেন্ডেলের। তবে তাঁকে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি। এর জন্য তিনি তাঁর ওপর ইউক্রেনের আরোপ করা নিষেধাজ্ঞাকে দায়ী করেছেন।

কারও কাছ থেকে অর্থ নেওয়া কিংবা “কোনো রাজনৈতিক শক্তির” সঙ্গে সমন্বয় করে মত তৈরির অভিযোগ মেন্ডেল অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, তিনি এএফডি ও ট্রাম্প প্রশাসনসহ সব পক্ষের সঙ্গেই “আলোচনায় উন্মুক্ত” এবং তিনি “খুশি যে পশ্চিমে এমন রাজনৈতিক শক্তি আছে, ইউক্রেন পরিস্থিতি নিয়ে যাদের দৃষ্টিভঙ্গি আমার সঙ্গে মেলে।”

ইউক্রেনের ভেতরে ও বাইরে অনেকেই মেন্ডেলের মতের সঙ্গে মৌলিকভাবে দ্বিমত পোষণ করেন। সমালোচনা উড়িয়ে দিয়ে তিনি বলেন, “শান্তির পথ সহজ নয়… এটি হবে খুবই বিতর্কিত, খুব কঠিন, অভিযোগ ও সমালোচনায় ভরা… কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো এই পথে হাঁটা।”

জেলেনস্কির দপ্তরের জবাব
জেলেনস্কির দপ্তরের এক মুখপাত্র বলেন, যুদ্ধ বা প্রেসিডেন্টের দপ্তরে সিদ্ধান্ত কীভাবে নেওয়া হয়, সে সম্পর্কে মেন্ডেলের “কখনোই কোনো তথ্যে প্রবেশাধিকার ছিল না।” তাঁর মতে, “তাঁর বক্তব্য শুধু তাঁর নিজের কল্পনা এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে যারা তাঁর জীবনযাপনের খরচ জোগায়, তাদের স্বার্থের প্রতিফলন।”

পটভূমি
মেন্ডেল বেড়ে উঠেছেন খেরসনে, রুশ হামলায় যে অঞ্চল এখন ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ও আংশিক দখলকৃত। সাংবাদিকতা করার পর মাত্র ৩২ বছর বয়সে বেছে নিয়ে তাঁকে জেলেনস্কির দপ্তরে নেওয়া হয়। তিনি এখন স্বামী পাভলো কুখতার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রে থাকেন, যিনি ইউক্রেনের সাবেক উপ-অর্থনীতিমন্ত্রী।

মেন্ডেল ২০২১ সালে, রুশ আক্রমণের প্রায় ১০ মাস আগে, প্রেস সচিবের পদ ছাড়েন। প্রথমে তিনি স্বাস্থ্যগত কারণের কথা বলেছিলেন। এখন বলছেন, নিয়োগকর্তার “অনিয়মিত” আচরণের কারণে পদত্যাগ করেছেন। তাঁর দাবি, “শান্তির এই খুব ভঙ্গুর ভারসাম্য ধরে রাখতে হলে একজন নেতার যেভাবে আচরণ করা উচিত, তিনি তা করছিলেন না।” জেলেনস্কির দপ্তর এটি দৃঢ়ভাবে অস্বীকার করে বলেছে, তিনি “মানসিকভাবে অস্থিতিশীল ছিলেন এবং সাংবাদিকদের সঙ্গে ক্রমাগত বিবাদে জড়াতেন” বলেই চলে যান। ২০১৯ সালে এক সাংবাদিককে জেলেনস্কিকে প্রশ্ন করা থেকে আটকাতে ধাক্কা দেওয়ায় তিনি ব্যাপক সমালোচিত হয়েছিলেন। মেন্ডেল বলেছিলেন, তিনি প্রেসিডেন্টের “ব্যক্তিগত পরিসর” রক্ষা করছিলেন।

সংবাদটি শেয়ার করুন