দিলারা চৌধুরী এবং তার স্বামীর বঙ্গবন্ধুবিরোধিতা ও ইতিহাস বিকৃতি’র শেকড় ১৯৭১-এ প্রোথিত

অথর
কুষ্টিয়া অনুসন্ধান নিউজ ডেক্স :   বাংলাদেশ
প্রকাশিত :9 October 2026, 5:57 AM | নিউজটি পড়া হয়েছে : 0 বার
দিলারা চৌধুরী এবং তার স্বামীর বঙ্গবন্ধুবিরোধিতা ও ইতিহাস বিকৃতি’র শেকড় ১৯৭১-এ প্রোথিত

কোনো মানুষের রাজনৈতিক অবস্থানকে বুঝতে হলে শুধু তার আজকের বক্তব্য শুনলেই হয় না। তার রাজনৈতিক ও পারিবারিক ইতিহাসের দিকেও তাকাতে হয়। বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো একটি দেশের ক্ষেত্রে, যেখানে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ রাষ্ট্রের জন্মের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত, সেখানে কোনো বুদ্ধিজীবীর রাজনৈতিক অবস্থান বোঝার ক্ষেত্রে একাত্তরে তিনি বা তার ঘনিষ্ঠ পরিবার কোন অবস্থানে ছিলেন—সেটি গুরুত্বপূর্ণ।

এই জায়গা থেকেই ড. দিলারা চৌধুরীর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও বাংলাদেশের স্বাধীনতা নিয়ে অবস্থানকে দেখার প্রয়োজন রয়েছে। কারণ, তার অবস্থানের শেকড় যে অনেক গভীরে, এবং তার পারিবারিক ইতিহাসের সঙ্গে যে পাকিস্তান রাষ্ট্রের অখণ্ডতার প্রশ্নটি জড়িয়ে আছে—এমন একটি রাজনৈতিক পাঠ অগ্রাহ্য করা কঠিন।

ড. দিলারা চৌধুরীর স্বামীর নাম জি. ডব্লিউ. চৌধুরী বা গোলাম ওয়াহেদ চৌধুরী। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ছিলেন।

১৯৭১ সালে যখন মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়, তিনি পাকিস্তান সরকারের পক্ষ নেন। মন্ত্রিসভা ভেঙে দেওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি ইয়াহিয়া সরকারের কেন্দ্রীয় যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ছিলেন। অবশ্য তার আগ থেকেই তিনি পাকিস্তান সরকারের নানা গুরুত্বপূর্ণ পদে ছিলেন। গোলাম ওয়াহেদ চৌধুরী ছিলেন একাত্তরের পাকিস্তানি সামরিক শাসক ইয়াহিয়া খানের সরকারের মন্ত্রী ও উপদেষ্টাদের একজন।

স্বাধীনতাবিরোধী ভূমিকার কারণে ১৯৭২ সালে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার জি. ডব্লিউ. চৌধুরীর নাগরিকত্ব বাতিল করে
১৯৭৩ সালের গেজেট নোটিফিকেশনে নাগরিকত্ব বাতিল হওয়া ব্যাক্তিদের তালিকায় গোলাম ওয়াহেদ চৌধুরীর নাম। (টাইপো-তে নাম “গোলাম ওয়াহের” হয়ে যাওয়ায় বাবার নাম ও জন্ম জেলার নামে নিশ্চিত হওয়া গেছে ইনিই গোলাম ওয়াহেদ চৌধুরী)
১৯৭৩ সালের গেজেট নোটিফিকেশনে নাগরিকত্ব বাতিল হওয়া ব্যাক্তিদের তালিকায় গোলাম ওয়াহেদ চৌধুরীর নাম। (টাইপো-তে নাম “গোলাম ওয়াহের” হয়ে যাওয়ায় বাবার নাম ও জন্ম জেলার নামে নিশ্চিত হওয়া গেছে ইনিই গোলাম ওয়াহেদ চৌধুরী)

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তিনি এতটাই মর্মাহত হয়েছিলেন যে বাংলাদেশে ফিরতে চাননি। পাকিস্তান থেকে সস্ত্রীক আমেরিকায় চলে গিয়েছিলেন। অবশ্য তার নিজের রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে তখন বাংলাদেশে ফিরে আসাও সহজ ছিল না।

জি. ডব্লিউ. চৌধুরীর লেখা বই “The Last Days of United Pakistan”
১৯৭৪ সালে গোলাম ওয়াহেদের প্রকাশিত The Last Days of United Pakistan বইয়ে অখণ্ড পাকিস্তানের প্রতি তার সমর্থনের বিষয়টি স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে। বইটি তার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে ১৯৬৯ থেকে ১৯৭১ সালের পাকিস্তানের রাজনৈতিক সংকট, ক্ষমতা হস্তান্তরের ব্যর্থতা এবং পাকিস্তান ভেঙে যাওয়ার ঘটনাকে বিশ্লেষণ করেছে।

অধ্যাপক চৌধুরী তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে চীন সফরেও যান। চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক এবং পাকিস্তানের ভূরাজনৈতিক অবস্থান নিয়েও তিনি বইটিতে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য তুলে ধরেছেন। ড. চৌধুরীর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন এবং হেনরি কিসিঞ্জার পূর্ব পাকিস্তানের মানবাধিকার লঙ্ঘন বা গণহত্যার চেয়ে তাদের ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থকে বেশি প্রাধান্য দিয়েছিলেন।

তিনি আরও লেখেন,

“মার্কিন প্রশাসন আশঙ্কা করেছিল যে পাকিস্তান ভেঙে গেলে এই অঞ্চলে সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রভাব (যেহেতু সোভিয়েত ইউনিয়ন ভারতকে সমর্থন করছিল) একচ্ছত্রভাবে বৃদ্ধি পাবে।”

কিন্তু বইটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—লেখক নিজে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় শাসনব্যবস্থার একজন অংশীজন হওয়ায় ১৯৭১-এর ঘটনাবলিকে তিনি যে দৃষ্টিকোণ থেকে দেখেছেন, সেটি মূলত অখণ্ড পাকিস্তানের দৃষ্টিকোণ।

বইটির বর্ণনায় বাঙালি জাতীয়তাবাদ, ছয় দফা এবং বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক কৌশলকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রকাঠামোর জন্য হুমকি হিসেবে দেখা হয়েছে। এমনকি তিনি লিখেছেন, ছয় দফা হুবহু বাস্তবায়িত হলে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে প্রতিরক্ষা ও বৈদেশিক বিষয় ছাড়া কার্যত আর কোনো ক্ষমতা থাকত না। তার দৃষ্টিতে এটি পাকিস্তানের ভাঙনের পথ তৈরি করত।

অর্থাৎ, জি. ডব্লিউ. চৌধুরীর চিন্তাচেতনা ছিল অখণ্ড পাকিস্তানের রাষ্ট্রকাঠামোর প্রতি অনুগত। ফলে তার The Last Days of United Pakistan গ্রন্থে বাঙালি জাতীয়তাবাদের আবেগ ও বাংলাদেশের স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষার চেয়ে পাকিস্তানকে ঐক্যবদ্ধ রাখার আকাঙ্ক্ষাই অনেক বেশি গুরুত্ব পেয়েছে।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বিরুদ্ধে বইটিতে বেশ কিছু নেতিবাচক ও সমালোচনামূলক অবস্থান ফুটে উঠেছে।

জি. ডব্লিউ. চৌধুরী বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধকে বাঙালির দীর্ঘদিনের জাতীয় মুক্তির আকাঙ্ক্ষার চূড়ান্ত যৌক্তিক পরিণতি হিসেবে দেখেননি। তার কাছে এটি ছিল একটি ঐতিহাসিক ট্র্যাজেডি—পাকিস্তান রাষ্ট্রের ভাঙনের ট্র্যাজেডি।

তিনি বইটিতে বঙ্গবন্ধুর ছয় দফাকে পাকিস্তানের ঐক্যের জন্য মৌলিক চ্যালেঞ্জ হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। বঙ্গবন্ধুর অবস্থানকে তিনি সংকটের অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে দাঁড় করানোর চেষ্টা করেছেন।

নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার পর বঙ্গবন্ধু কেন জনগণের ম্যান্ডেট অনুযায়ী ছয় দফার প্রশ্নে আপসহীন ছিলেন, তা একজন বাঙালি হিসেবে চৌধুরী অনুধাবন করতে ব্যর্থ হয়েছেন—এমন সমালোচনা করা যায়।

তিনি বঙ্গবন্ধুকে একজন “একগুঁয়ে” বা rigid রাজনীতিবিদ হিসেবে চিত্রায়িত করার চেষ্টা করেছেন, যিনি পাকিস্তানের অখণ্ডতা রক্ষার স্বার্থে নিজের অবস্থান থেকে নমনীয় হতে রাজি হননি। ড. চৌধুরীর মতে, শেখ মুজিবের এই অনমনীয় মনোভাব আলোচনার মাধ্যমে রাজনৈতিক সংকট সমাধানের পথ বন্ধ করে দিয়েছিল।

কিন্তু এখানেই ইতিহাসের আরেকটি প্রশ্ন সামনে আসে।

১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জাতীয় পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছিল। সেই নির্বাচনী ম্যান্ডেটের ভিত্তিতে ক্ষমতা হস্তান্তরের দাবি এবং পাকিস্তানি সামরিক শাসকদের তা বাস্তবায়নে ব্যর্থতা—এই বৃহত্তর রাজনৈতিক বাস্তবতাকে বাদ দিয়ে শুধু বঙ্গবন্ধুর “অনমনীয়তা” দিয়ে ১৯৭১-এর সংকট ব্যাখ্যা করা অসম্পূর্ণ।

মুক্তিযুদ্ধের সময়কালীন পূর্ব পাকিস্থানে থেকে পাকিস্থানি সামরিক বাহিনীকে সহায়তাকারী “কোলাবরেটর” দের তালিকায় গোলাম ওয়াহেদ চৌধুরী।
মুক্তিযুদ্ধের সময়কালীন পূর্ব পাকিস্থানে থেকে পাকিস্থানি সামরিক বাহিনীকে সহায়তাকারী “কোলাবরেটর” দের তালিকায় গোলাম ওয়াহেদ চৌধুরী।

সত্তরের নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে পূর্ব পাকিস্তানে যে তীব্র গণজোয়ার ও বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিস্ফোরণ ঘটেছিল, তাকে ড. চৌধুরী বইটিতে এক ধরনের উগ্র আবেগ হিসেবে দেখেছেন। তার মতে, এই তীব্র আবেগ ও চাপ আওয়ামী লীগ নেতৃত্বকে যৌক্তিক ও বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত নিতে বাধা দিয়েছিল এবং পরিস্থিতিকে যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিয়েছিল।

পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর মতো ড. চৌধুরীর বয়ানেও বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে ভারতের ভূমিকাকে অত্যন্ত নেতিবাচক ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হিসেবে দেখানোর প্রবণতা ছিল। তিনি পাকিস্তানের ভাঙনের পেছনে ভারতের দীর্ঘদিনের পরিকল্পনা এবং সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপকে বড় কারণ হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। এর ফলে বাঙালির স্বতঃস্ফূর্ত ও দীর্ঘদিনের জাতীয় মুক্তির আকাঙ্ক্ষা এবং সশস্ত্র প্রতিরোধের ভূমিকা তার বয়ানে তুলনামূলকভাবে আড়ালে চলে যায়।

জি. ডব্লিউ. চৌধুরী ২৫ মার্চের গণহত্যার জন্য ইয়াহিয়া খান এবং রাজনৈতিক সংকটের জন্য জুলফিকার আলী ভুট্টোর তীব্র সমালোচনা করলেও, তিনি নিজে পাকিস্তানি আমলা ও কেন্দ্রীয় মন্ত্রী হিসেবে যে রাজনৈতিক কাঠামোর অংশ ছিলেন, সেই অবস্থান থেকে বঙ্গবন্ধুর আপসহীন নেতৃত্ব এবং বাংলাদেশের সশস্ত্র স্বাধীনতা যুদ্ধকেই পাকিস্তানের অখণ্ডতা ধ্বংসের অন্যতম কারণ হিসেবে বিবেচনা করেছেন।

ফলে তার এই বয়ানকে একাত্তরের ইতিহাসের একটি পাকিস্তানকেন্দ্রিক ও একপেশে ব্যাখ্যা হিসেবে পাঠ করা যায়।

একজন কট্টর পাকিস্তানপন্থী আমলা ও শিক্ষাবিদ হিসেবে জি. ডব্লিউ. চৌধুরী ১৬ ডিসেম্বরের আত্মসমর্পণকে অখণ্ড পাকিস্তানের ইতিহাসের সবচেয়ে অন্ধকার ও দুঃখজনক দিন হিসেবে দেখেছেন।

তার মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও চীন নিজেদের ভূরাজনৈতিক স্বার্থে এবং পাকিস্তানের কূটনৈতিক বার্তার কারণে অখণ্ড পাকিস্তানের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিল। তবে তাদের এই সমর্থন পাকিস্তানি জেনারেলদের মধ্যে এক ধরনের মিথ্যা আশার (False Hope) জন্ম দিয়েছিল, যা রাজনৈতিক সমাধানের পরিবর্তে তাদের যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার পথে ঠেলে দেয় এবং শেষ পর্যন্ত পাকিস্তানের পতন ডেকে আনে।

৭১’এ পাকিস্থানের পরাজয়কে “ঐতিহাসিক ট্র্যাজেডি” হিসাবে আখ্যায়িত করা গোলাম ওয়াহেদ ঠিক ৭১ বছর বয়েসেই মারা যান।
৭১’এ পাকিস্থানের পরাজয়কে “ঐতিহাসিক ট্র্যাজেডি” হিসাবে আখ্যায়িত করা গোলাম ওয়াহেদ ঠিক ৭১ বছর বয়েসেই মারা যান।

এই জায়গাটিই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একজন মানুষ কীভাবে ১৯৭১-কে দেখছেন, তা অনেকাংশেই নির্ভর করে তিনি ১৯৭১-কে কোন রাষ্ট্রের চোখ দিয়ে দেখছেন—পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় অখণ্ডতার সংকট হিসেবে, নাকি বাঙালির জাতীয় মুক্তির যুদ্ধ হিসেবে।

১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করা হয়। এরপর ১৯৭৮ সালে জিয়াউর রহমানের শাসনামলে বিশেষ সাধারণ ক্ষমার অধীনে জি. ডব্লিউ. চৌধুরী সস্ত্রীক সপরিবারে পুনরায় দেশে প্রত্যাবর্তন করেন। সে সময় গোলাম আজমও দেশে ফিরে আসেন।

দেশে ফেরার কিছু পরে দিলারা চৌধুরী জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে শিক্ষকতা শুরু করেন। এখানেই এসে বর্তমানের দিলারা চৌধুরীর বক্তব্যের সঙ্গে অতীতের এই পারিবারিক রাজনৈতিক ইতিহাসকে পাশাপাশি রাখার প্রয়োজন হয়।

দিলারা চৌধুরী এক পডকাস্টে বলেছেন, ১৯৭২ সালে দেশে ফিরে শেখ মুজিব রেডিও-টেলিভিশনে আজান বন্ধ করে দিয়েছিলেন, – যা একেবারে সর্বৈব মিথ্যা
১৯৭১ সালে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর রেডিও-টেলিভিশনে আজান বন্ধ তো দূরের কথা, বরং রাষ্ট্রীয় তত্ত্বাবধানে বিভিন্ন ধরনের ইসলামিক অনুষ্ঠান প্রচারিত হয়েছে—এমন তথ্য পাওয়া যায়। তখন রেডিও-টেলিভিশনের অনুষ্ঠান আজকের মতো সারাদিন ধরে চলত না। দিনের নির্দিষ্ট সময় অনুষ্ঠান প্রচারিত হতো। কোনো আজানের সময় সম্প্রচারের সময়সীমার মধ্যে পড়লে সেটি প্রচারিত হতো।

অতএব, বঙ্গবন্ধু রেডিও-টেলিভিশনে আজান বন্ধ করে দিয়েছিলেন—এমন একটি বক্তব্যের পক্ষে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ প্রয়োজন। আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, বঙ্গবন্ধুর সরকার ইসলাম ও মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার কোনো নীতি অনুসরণ করেনি।

১৯৭৪ সালে ওআইসির সদস্যপদ পাওয়ার জন্য বঙ্গবন্ধু পাকিস্তান সফর করেছিলেন। সেখানে তিনি জুলফিকার আলী ভুট্টোর সঙ্গে বৈঠক করেন। ২২ ফেব্রুয়ারি ১৯৭৪ পাকিস্তান বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেওয়ার পর বঙ্গবন্ধু লাহোরে ওআইসি সম্মেলনে যোগ দেন এবং বাংলাদেশ ওআইসির সদস্য হয়।

অর্থাৎ, স্বাধীনতার মাত্র তিন বছরের মাথায় পাকিস্তানের মাটিতে গিয়ে বঙ্গবন্ধুর ওআইসি সম্মেলনে অংশ নেওয়া—“তিনি ইসলাম বা মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক রাখতে চাননি” ধরনের সরলীকৃত বয়ানকে অন্তত প্রশ্নের মুখে ফেলে।

১৯৭৫ সালে তিনি ইসলামিক ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ঐতিহাসিক সূত্রে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের বর্তমান সাংগঠনিক রূপ ১৯৭৪ সালে প্রতিষ্ঠা/উদ্বোধনের সঙ্গে যুক্ত; আবার ১৯৭৫ সালের একটি মার্কিন কূটনৈতিক নথিতে মার্চ ১৯৭৫-এ বঙ্গবন্ধুর ইসলামিক ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

কিন্তু বঙ্গবন্ধু আজান বন্ধ করে দিয়েছিলেন—দিলারা চৌধুরীর এমন বক্তব্যের সঙ্গে ইতিহাসের এই বাস্তবতাগুলো মেলানো কঠিন।

আর হজের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। স্বাধীনতার পর সৌদি আরব দীর্ঘ সময় বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়নি। ফলে বাংলাদেশি নাগরিকদের হজ পালনে বাস্তব কূটনৈতিক সমস্যা তৈরি হয়েছিল। একটি গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে, বঙ্গবন্ধুর সরকার ভারতীয় ভিসার মাধ্যমে বাংলাদেশিদের হজ পালনের ব্যবস্থা করেছিল এবং হজযাত্রীদের জন্য সরকারি সহায়তার ব্যবস্থাও করেছিল।

১৯৭৪ সালে পাকিস্তানের স্বীকৃতি এবং ওআইসিতে বাংলাদেশের যোগদানও দেখায় যে বঙ্গবন্ধুর পররাষ্ট্রনীতি ছিল শুধু ভারত বা পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্কনির্ভর নয়; মুসলিম বিশ্বের সঙ্গেও সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা তার রাষ্ট্রীয় কূটনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল।

তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে—দিলারা চৌধুরীর মতো একজন শিক্ষাবিদ কেন বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে এমনভাবে উপস্থাপন করেন?

এর উত্তর খুঁজতে গেলে তার নিজের রাজনৈতিক অবস্থানের পাশাপাশি তার স্বামীর রাজনৈতিক অতীতও সামনে আসে।

জি. ডব্লিউ. চৌধুরী এমন একজন মানুষ ছিলেন, যিনি ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় কাঠামোর পক্ষে ছিলেন এবং পরবর্তীতে The Last Days of United Pakistan গ্রন্থে পাকিস্তানের ভাঙনকে মূলত পাকিস্তানের দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করেছেন। তার বইয়ে বঙ্গবন্ধুর ছয় দফা, বাঙালি জাতীয়তাবাদ এবং স্বাধীনতার আন্দোলন সম্পর্কে তীব্র সমালোচনামূলক অবস্থান রয়েছে।

তাই দিলারা চৌধুরীর বর্তমান বক্তব্যগুলোকে শুধু বিচ্ছিন্ন কিছু মতামত হিসেবে না দেখে তার পারিবারিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক উত্তরাধিকারের আলোতেও দেখা যায়—এমন একটি মত পোষণ করা অসম্ভব নয়।

দিলারা হয়তো মনে করেছেন, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের অধ্যায় শেষ হয়ে গেছে, ইতিহাসের সেই প্রশ্ন আর গুরুত্বপূর্ণ নয়; হয়তো তার কাছে মনে হয়েছে তার স্বপ্নের পাকিস্তানপন্থী রাজনৈতিক বয়ান আবার ফিরে আসার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

কিন্তু ডঃ দিলারা, আপনি বারে বারে ভুল প্রমাণিত হবেন, আগেও হয়েছেন। এখন মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের মানুষেরা একটু কোণঠাসা অবস্থায় আছে বলে, এই মোক্ষম সময়ে আপনি আবার পুরানো বয়ান প্রতিষ্ঠা করার মাধ্যমে আসলে ইতিহাসে স্থান করে নিতে চাইছেন। নতুন করে ইতিহাসে একটু স্থান চাইছেন, কারন আপনি জানেন আপনার ও আপনার পরিবারের আসল পরিচয় ও ইতিহাস নিয়ে মুক্তিযুদ্ধের বাংলায় আপনারা আজীবনই ঘৃণিত থাকবেন।

আমার বাংলাদেশ পার্টি- এবি পার্টির উদ্যোগে দলটির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে জনআকাঙ্ক্ষার বাংলাদেশ ঘোষণার স্মৃতিচারণ ও উদ্যোক্তাদের পুনর্মিলনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসাবে দিলারা জামান। এপ্রিল, ২০২৪।
আমার বাংলাদেশ পার্টি- এবি পার্টির উদ্যোগে দলটির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে জনআকাঙ্ক্ষার বাংলাদেশ ঘোষণার স্মৃতিচারণ ও উদ্যোক্তাদের পুনর্মিলনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসাবে দিলারা জামান। এপ্রিল, ২০২৪।

এই দেশে কোনোদিন মুক্তিযুদ্ধ অপ্রাসঙ্গিক হবে না।
কারণ মুক্তিযুদ্ধ শুধু একটি রাজনৈতিক দলের সম্পত্তি নয়। এটি বাংলাদেশের রাষ্ট্রসত্তার জন্মের ইতিহাস। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক থাকতে পারে, তার শাসনামলের ভুল-ত্রুটি নিয়ে আলোচনা হতে পারে, তার অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের সমালোচনা হতে পারে—এমনকি তার ধর্মনীতি নিয়েও কঠোর সমালোচনা হতে পারে। কিন্তু সেই সমালোচনার নামে ১৯৭১-এর ইতিহাসকে বিকৃত করা বা প্রমাণহীন দাবি প্রতিষ্ঠা করা অন্য বিষয়।

একজন সিনিয়র বুদ্ধিজীবী সম্পর্কে জানতে হলে তার বর্তমান বক্তব্যের পাশাপাশি ১৯৭১ সালে তার ভূমিকা কী ছিল, সেটিও খুঁজে দেখা দরকার। তিনি তখন কী অবস্থানে ছিলেন, কোন রাষ্ট্রের পক্ষে ছিলেন, কী লিখেছিলেন, কী বলেছিলেন—এসব প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ।

যদি দেখা যায়, কেউ তখন জোয়ান থাকা সত্ত্বেও একাত্তরের প্রশ্নে এমন অবস্থানে ছিলেন, যা বাংলাদেশের স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষার বিপরীত ছিল, তাহলে তার পরবর্তী রাজনৈতিক বক্তব্য মূল্যায়নের সময় সেই ইতিহাস অবশ্যই বিবেচনায় রাখতে হবে।

আপনি তাকে বাংলাদেশবিরোধী বলবেন কি না, সেটি আপনার সিদ্ধান্ত। কিন্তু ইতিহাস তার নিজের সাক্ষ্য রেখে যায়।

আর অনেক সময় মানুষ যতদিন তার রাজনৈতিক অবস্থানকে আড়াল করে রাখতে পারে, ততদিন তাকে নিরপেক্ষ মনে হতে পারে। কিন্তু ইতিহাসের দীর্ঘ পরিসরে সেই খোলস একসময় ভেঙে যায়।

১৯৭১-এর প্রশ্নে তাই মূল বিষয় ব্যক্তি-বিশেষের প্রতি ভালোবাসা বা ঘৃণা নয়; মূল প্রশ্ন হলো—বাংলাদেশের জন্মকে আমরা কোন ইতিহাসের আলোকে দেখব। পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাঙনের ট্র্যাজেডি হিসেবে, নাকি বাঙালির জাতীয় মুক্তির ইতিহাস হিসেবে। এই দুই বয়ান এক নয়। এই দুই পক্ষও কখনো এক নয়।

আর সেই কারণেই দিলারা চৌধুরীর বঙ্গবন্ধুবিরোধী বক্তব্যের শেকড় খুঁজতে গেলে তার স্বামীর ১৯৭১-এর রাজনৈতিক অবস্থান এবং The Last Days of United Pakistan-এর বয়ানকে পাশ কাটিয়ে যাওয়া যায় না।

সংবাদটি শেয়ার করুন

আরও পড়ুন