বিপন্ন মানবাধিকার: এক মাসেই ৭১ অজ্ঞাত লাশ ও ২৪ কারাবন্দীর রহস্যজনক মৃত্যু
সদ্য সমাপ্ত সেপ্টেম্বর মাসে দেশের মানবাধিকার ও সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে এক উদ্বেগজনক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন (এমএসএফ)।
দেশের প্রধান প্রধান গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর এবং নিজস্ব তথ্য সংগ্রহের ওপর ভিত্তি করে তৈরি এই পর্যালোচনায় দেখা যায়, আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা এবং কারা হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে।
সেপ্টেম্বর মাসে ‘মব’ সহিংসতা বা গণপিটুনির মতো অন্তত ৬৫টি ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় ২৩ জন নিহত এবং ৭৪ জন আহত হয়েছেন।
সাধারণ অপরাধ বা পারিবারিক ও রাজনৈতিক বিরোধকে কেন্দ্র করে সাধারণ মানুষের আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার এই প্রবণতা নাগরিক নিরাপত্তাকে বড় ধরনের হুমকির মুখে ফেলেছে।
মূলত চুরি-ডাকাতির সন্দেহ, জমি জমা ও অর্থনৈতিক বিরোধ, বাকবিতণ্ডা এবং যৌন সহিংসতার অজুহাতে এসব মব সহিংসতার ঘটনা ঘটে।
এমএসএফ-এর তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বর মাসে কারা হেফাজতে ২৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর আগের মাস আগস্টে এই সংখ্যাটি ছিল মাত্র ৯, অর্থাৎ এক মাসের ব্যবধানে কারা হেফাজতে মৃত্যুর সংখ্যা অর্ধেকেরও বেশি বেড়েছে।
এছাড়া আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজতে এক নারীর মৃত্যুর তথ্যও নথিভুক্ত করা হয়েছে।
সেপ্টেম্বর মাসে রাজনৈতিক সহিংসতায় অন্তত ১ জন নিহত এবং ৩৮৪ জন আহত হয়েছেন। পাশাপাশি অশনাক্ত হামলায় আরও ৭ জনের মৃত্যু হয়েছে।
উদ্বেগজনক বিষয় হলো, সেপ্টেম্বর মাসেই দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ৭১টি অজ্ঞাতনামা লাশ উদ্ধার করা হয়েছে, যার মধ্যে ৫৫ জন পুরুষ, ১৫ জন নারী এবং ১ জনের বয়স ও লিঙ্গ চিহ্নিত করা সম্ভব হয়নি।
সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতায় শারীরিক আক্রমণ কিছুটা কমলেও আইনি চাপ ও হয়রানি বৃদ্ধি পেয়েছে। সেপ্টেম্বর মাসে ২৮ জন সাংবাদিক নির্যাতন ও হামলার শিকার হয়েছেন এবং ৯ জন মুখোমুখি হয়েছেন আইনি জটিলতার।
একই সঙ্গে সাইবার ও ডিজিটাল আইনের প্রয়োগ বাড়ার প্রমাণ মিলেছে। আগস্টের ৩টি মামলার বিপরীতে সেপ্টেম্বরে ডিজিটাল বা সাইবার নিরাপত্তা আইনে ৮টি মামলা নথিভুক্ত হয়েছে এবং গ্রেপ্তারের সংখ্যা ৩ থেকে বেড়ে ৮ জনে দাঁড়িয়েছে।
সংখ্যালঘু সম্প্রদায় ও তাদের উপাসনালয়ের ওপর হামলার ঘটনাও উঠে এসেছে প্রতিবেদনে। সেপ্টেম্বরে দেশের বিভিন্ন স্থানে ১০টি প্রতিমা ভাঙচুর এবং ১টি জাতিগত নির্যাতনের ঘটনা ঘটে।
পাশাপাশি কুষ্টিয়ার মহাশ্মশানে গরু জবাই করে পিকনিক করা এবং চিতা ও সমাধির ওপর জুতা পায়ে ছবি তোলার মাধ্যমে ধর্মীয় মূল্যবোধে আঘাত হানা ও উসকানিমূলক কর্মকাণ্ডের বিষয়টি এমএসএফ তুলে ধরেছে।
সীমান্ত এলাকায় ভারতীয় সীমান্ত রক্ষী বাহিনী (বিএসএফ)-এর গুলিতে বাংলাদেশি নাগরিক নিহত ও আহত হওয়ার ঘটনার পাশাপাশি বেআইনিভাবে পুশইনের (ঠেলে পাঠানো) চেষ্টা নথিভুক্ত হয়েছে।
অন্যদিকে মিয়ানমার সীমান্তে আরাকান আর্মির গুলিতে অন্তত ১ জন বাংলাদেশি নাগরিক আহত হয়েছেন।
সংস্থাটি মনে করে, আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার সংস্কৃতি রোধ, কারা হেফাজতে মৃত্যুর নিরপেক্ষ তদন্ত এবং সীমান্তসহ দেশের অভ্যন্তরীণ মানবাধিকার সুরক্ষায় দ্রুত কার্যকর ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি।























