১০ এয়ারবাস ক্রয়ের চুক্তি করলো বিমান; অথচ বাংলাদেশের অর্থনীতি নিয়ে শঙ্কায় বিশ্বব্যাংক-এডিবি
যুক্তরাষ্ট্রের উড়োজাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বোয়িংয়ের কাছ থেকে ২৫টি উড়োজাহাজ কেনার চুক্তির পর এবার ইউরোপীয় নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এয়ারবাসের সঙ্গে ১০টি উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি করেছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস।
একদিকে জাতীয় পতাকাবাহী এই বিমান সংস্থার বহর আধুনিকায়নের উদ্যোগ, অন্যদিকে দেশের অর্থনীতির বর্তমান বাস্তবতা—দুই বিষয়কে ঘিরেই উঠছে বড় প্রশ্ন: এত বিপুলসংখ্যক উড়োজাহাজ কেনার অর্থের জোগান কীভাবে হবে এবং শেষ পর্যন্ত এসব ঋণের দায় বহন করবে কে?
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের বহর সম্প্রসারণের এই উদ্যোগ এমন এক সময়ে সামনে এলো, যখন দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দীর্ঘদিনের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে প্রায় ৩ শতাংশের কাছাকাছি নেমে এসেছে। একই সময়ে বিপুলসংখ্যক মানুষ দারিদ্র্য ও নিম্নআয়ের চাপে রয়েছেন। ফলে নতুন উড়োজাহাজ কেনার পরিকল্পনা নিয়ে অর্থনৈতিক বাস্তবতা, ঋণের বোঝা এবং বিনিয়োগের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন অর্থনীতিবিদ ও সংশ্লিষ্টরা।
বোয়িংয়ের সঙ্গে ২৫টি উড়োজাহাজ কেনার চুক্তির পর এয়ারবাসের কাছ থেকে আরও ১০টি উড়োজাহাজ কেনার সিদ্ধান্তের অর্থ হলো, ভবিষ্যতে বিমান বাংলাদেশের বহরে একসঙ্গে বড় ধরনের সম্প্রসারণ ঘটতে যাচ্ছে। উড়োজাহাজ কেনার পাশাপাশি এসব বিমানের রক্ষণাবেক্ষণ, যন্ত্রাংশ, ক্রু প্রশিক্ষণ, বীমা, জ্বালানি এবং পরিচালন ব্যয়ও বহন করতে হবে।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হচ্ছে—এই বিনিয়োগ থেকে পর্যাপ্ত আয় তৈরি হবে তো?
উড়োজাহাজ কেনার অর্থ সাধারণত দীর্ঘমেয়াদি ঋণ, লিজিং বা অন্যান্য অর্থায়ন ব্যবস্থার মাধ্যমে পরিশোধ করা হয়। ফলে বিমান বাংলাদেশ লাভজনকভাবে পরিচালিত না হলে কিংবা প্রত্যাশিত যাত্রী ও কার্গো আয় না এলে ঋণের কিস্তি পরিশোধের চাপ শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের ওপর পড়তে পারে। অর্থাৎ বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের আর্থিক ঝুঁকি পরোক্ষভাবে জনগণের অর্থের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।
বিশেষ করে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি যখন চাপে, তখন বড় অঙ্কের বৈদেশিক ঋণ নিয়ে একসঙ্গে এতগুলো উড়োজাহাজ কেনা কতটা সময়োপযোগী—সে প্রশ্নও সামনে এসেছে।
বাংলাদেশের বিমান পরিবহন খাতে অবশ্য দীর্ঘমেয়াদি সম্ভাবনা রয়েছে। দেশের ক্রমবর্ধমান প্রবাসী জনগোষ্ঠী, আন্তর্জাতিক শ্রমবাজার, পর্যটন, ব্যবসায়িক যোগাযোগ এবং আঞ্চলিক বিমান চলাচল ভবিষ্যতে যাত্রীসংখ্যা বাড়াতে পারে। নতুন প্রজন্মের জ্বালানি-সাশ্রয়ী উড়োজাহাজ পরিচালনা ব্যয় কমাতেও ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে সম্ভাবনা আর বাস্তব আয় এক বিষয় নয়। নতুন ৩৫টি উড়োজাহাজের অর্থনৈতিক কার্যকারিতা নির্ভর করবে বিমান বাংলাদেশ কতটা দক্ষতার সঙ্গে এগুলো ব্যবহার করতে পারছে, কতটা যাত্রী পাচ্ছে, কোন রুটে পরিচালনা করছে এবং প্রতিটি উড়োজাহাজ থেকে কতটা রাজস্ব ও মুনাফা অর্জন করতে পারছে তার ওপর।
এখানেই প্রশ্ন উঠছে, যে দেশে প্রবৃদ্ধি প্রায় ৩ শতাংশের ঘরে, বিপুলসংখ্যক মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বা নিম্নআয়ের চাপে এবং রাষ্ট্রীয় অর্থব্যবস্থায় ঋণের চাপ বাড়ছে—সেখানে এত বড় বহর সম্প্রসারণের আর্থিক ঝুঁকি কতটা?
শুধু উড়োজাহাজ কেনার মূল্য নয়, আগামী কয়েক দশক ধরে এগুলোর ঋণ পরিশোধ, সুদ, রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচালন ব্যয় মিলিয়ে প্রকৃত আর্থিক দায় কত দাঁড়াবে—তার পূর্ণাঙ্গ হিসাবও জনসমক্ষে থাকা প্রয়োজন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিমান বাংলাদেশ যদি নতুন উড়োজাহাজগুলো লাভজনক আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক রুটে কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে পারে, তাহলে এটি দীর্ঘমেয়াদে রাজস্ব বাড়ানোর সুযোগ তৈরি করতে পারে। কিন্তু সঠিক ব্যবসায়িক পরিকল্পনা ছাড়া বহর বাড়ানো হলে নতুন উড়োজাহাজই উল্টো আর্থিক বোঝায় পরিণত হতে পারে।
অর্থনৈতিক সংকটের সময়ে রাষ্ট্রীয় অর্থে এমন বড় বিনিয়োগের ক্ষেত্রে এসব হিসাব জনগণের সামনে স্পষ্ট করা জরুরি। কারণ শেষ পর্যন্ত বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ব্যবসায়িক সাফল্য বা ব্যর্থতার আর্থিক প্রভাব শুধু একটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের হিসাবেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; এর দায় এসে পড়তে পারে রাষ্ট্রের কোষাগার এবং করদাতাদের ওপরও।
৬ কোটি মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে, প্রবৃদ্ধি ৩ শতাংশের কাছাকাছি—এই বাস্তবতায় নতুন ৩৫টি উড়োজাহাজ বাংলাদেশের জন্য অর্থনৈতিক বিনিয়োগ, নাকি ভবিষ্যতের ঋণের বোঝা—তার উত্তর নির্ভর করবে হিসাবের স্বচ্ছতা ও বিমান বাংলাদেশের ব্যবসায়িক সক্ষমতার ওপর।























