ফিরতে আমাকে হবেই, আকাশ আমার ছাদ আর মাটি হবে ঘর’— গণমাধ্যমের মুখোমুখি শেখ হাসিনা

অথর
কুষ্টিয়া অনুসন্ধান নিউজ ডেক্স :   বাংলাদেশ
প্রকাশিত :31 October 2026, 6:57 PM | নিউজটি পড়া হয়েছে : 2 বার
ফিরতে আমাকে হবেই, আকাশ আমার ছাদ আর মাটি হবে ঘর’— গণমাধ্যমের মুখোমুখি শেখ হাসিনা

বাংলা নিউজ নেটওয়ার্কের বিশেষ লাইভ অনুষ্ঠানে সাংবাদিক সুলতানা রহমানের নেওয়া এক সরাসরি সাক্ষাৎকারে মুখোমুখি হন বঙ্গবন্ধু কন্যা, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতি ও গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। দীর্ঘ এই সাক্ষাৎকারে দেশে ফেরার চূড়ান্ত প্রস্তুতি, ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের ঐতিহাসিক বাড়ি ভাঙচুর, কথিত ছাত্র আন্দোলন, নির্বাচন প্রক্রিয়া, আইসিটি ট্রাইব্যুনাল এবং বর্তমান সরকারের শাসনকালসহ জাতীয় রাজনীতি ও ব্যক্তিগত অনুভূতির নানা দিক খোলাখুলিভাবে তুলে ধরেন তিনি।

সাক্ষাৎকারের বিস্তারিত বিবরণ ও প্রশ্নোত্তর:

 

কেমন আছেন ও দেশে ফেরার প্রস্তুতি

​সাংবাদিক সুলতানা রহমান জানতে চান, কোটি কোটি মানুষ জানতে আগ্রহী যে তিনি বর্তমানে কেমন আছেন এবং দেশে ফেরার ব্যাপারে কী প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

​শেখ হাসিনা বলেন:

“আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি দেশে যাব। আর কতদিন দেশছাড়া থাকব? দেশের মানুষ যদি ভালো থাকত, তবে হয়তো আমার দুঃখ থাকত না। কিন্তু আজ যখন দেখি মানুষ ক্ষুধার্ত, নিরাপত্তাহীন এবং অর্থনীতি সম্পূর্ণ ধ্বংসপ্রাপ্ত, তখন আর দূরে থাকা যায় না। আমার পাসপোর্ট ও জাতীয় পরিচয়পত্র বন্ধ করা হয়েছে। তবে আমি মানসিকভাবে তৈরি। মোটামুটি আমি প্রস্তুত, ইতিমধ্যে সবকিছু গুছিয়ে রেখেছি। আমাকে যেতে হবে সেই প্রস্তুতিও নিয়েছি। মানসিকভাবে আমি সম্পূর্ণ প্রস্তুত। ফিরতে আমাকে হবেই!”

 

আইনি প্রক্রিয়া ও ট্রাভেল পাস প্রসঙ্গ

​ট্রাভেল পাস ও আইনি প্যানেলের আবেদনের অগ্রগতি সম্পর্কে সাংবাদিকের প্রশ্নের উত্তরে তিনি স্পষ্ট করেন:

​শেখ হাসিনা জানান:

“অনেকে অনেক পরামর্শ দিচ্ছেন। আইনজীবীরা চেষ্টা করছেন যেন আমার বন্ধ করা পাসপোর্ট অ্যাক্টিভেট করা হয় অথবা ট্রাভেল পাস দেওয়া হয়। তারা যদি ট্রাভেল পাস নাও দেয়, সে ক্ষেত্রে অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা নিতে হবে। তবে যেকোনো প্রক্রিয়ায় হোক, দেশে ফেরার সিদ্ধান্তে আমি প্রস্তুত।”

​

দলীয় নেতাকর্মীদের অবস্থা ও বর্তমান সংকট

​বিগত সময়ে নেতাকর্মীদের ওপর নির্যাতন এবং দলের অভ্যন্তরীণ মূল্যায়ন নিয়ে জানতে চাইলে তিনি বর্তমান পরিস্থিতির রূপরেখা তুলে ধরেন।

​শেখ হাসিনা বলেন:
“তৃণমূল থেকে শুরু করে শীর্ষ পর্যায় পর্যন্ত দলের সব নেতাকর্মী চরম নির্যাতনের শিকার হয়েছে। এ সংকট পরিকল্পিতভাবে তৈরি করা হয়েছে। দেশের শিক্ষা, সামাজিক মূল্যবোধ এবং শিক্ষকদের সম্মান জানানোর সংস্কৃতি পর্যন্ত আজ ধূলিসাৎ করে দেওয়া হয়েছে।”

 

নির্বাচন ও জনগণের ভোট অধিকার

​দেশে ফেরার পর নির্বাচন দাবি করবেন কি না এবং তা কোন প্রক্রিয়ায়—সুলতানা রহমানের এই প্রশ্নের জবাবে শেখ হাসিনা জনগণের রায়ের গুরুত্ব জোর দিয়ে ব্যাখ্যা করেন।

​শেখ হাসিনা বলেন:
“অবশ্যই নির্বাচন দিতে হবে। সাংবিধানিকভাবে নির্বাচিত একটি সরকারকে অসাংবিধানিকভাবে উৎখাত করে ক্ষমতা দখল করা এবং আওয়ামী লীগকে বাইরে রেখে বা বয়কট করিয়ে কোনো নির্বাচন করা ইনক্লুসিভ হতে পারে না। জনগণের ওপর সিদ্ধান্ত ছাড়তে হবে। দেশের ৫০ শতাংশের বেশি ভোটার আওয়ামী লীগকে সমর্থন করে, তাদের বঞ্চনা করে কোনো বৈধ নির্বাচন সম্ভব নয়।”

 

আইসিটি ট্রাইব্যুনাল ও আইনি মুখোমুখি হওয়া

​আইসিটি ট্রাইব্যুনালের রায় ও দেশে ফিরে আইনি লড়াই প্রসঙ্গে তিনি বলেন: “এই ট্রাইব্যুনাল কীভাবে গঠন করা হয়েছে তা সবাই জানে। মূল ১৯৭৩ সালের আইনের তোয়াক্কা না করে এটি একটি রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। আমাকে তারা ফাঁসি দিতে পারে, খুন করতে পারে, গুলি করে মারতেও পারে। কিন্তু আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে আমি জনগণের টানেই ফিরে আসব।”

 

একাধিক হত্যাচেষ্টা ও বেঁচে ফেরার অভিজ্ঞতা

​বারবার জীবনের ঝুঁকিতে পড়া নিয়ে সাংবাদিকের মন্তব্যের প্রেক্ষিতে শেখ হাসিনা তাঁর সংগ্রামের কথা স্মরণ করেন।

​শেখ হাসিনা বলেন: “কোটালিপাড়ায় ৭৬ কেজির বোমা, চট্টগ্রামের ২৪শে জানুয়ারির গুলিবর্ষণ, কিংবা ২০০৪ সালের ২১শে আগস্টের গ্রেনেড হামলা—আমার নেতাকর্মীরা মানবঢাল তৈরি করে আমাকে বাঁচিয়েছে। আল্লাহ বারবার আমাকে রক্ষা করেছেন। তাই জীবনের পরোয়া না করে দেশের মানুষের জীবনের মান উন্নয়নে ঝুঁকি নিয়েই মাঠে দাঁড়াব।”

​ শাসক বনাম জনগণের সেবক

​বিদেশে থেকে পুনরায় ফিরে আসার ইতিহাস তৈরি করা প্রসঙ্গে তিনি তাঁর দর্শনের কথা বলেন: “আমি কখনোই নিজেকে শাসক মনে করিনি, আমি জনগণের সেবক। প্রধানমন্ত্রী পদ বা প্রটোকল আমি মানতাম না, কারণ আমাকে কাজের জন্য খাটতে হতো। সে কারণেই ১৫ বছরে একটি দেশকে দারিদ্র্যমুক্ত করে উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদায় উন্নীত করা সম্ভব হয়েছিল।”

​ দেশবাসীর উদ্দেশ্যে শেষ বার্তা ও বাসস্থানের চিন্তা

​সাক্ষাৎকারের চূড়ান্ত পর্যায়ে সাংবাদিক সুলতানা রহমান জানতে চান যে দেশে ফিরে তিনি কোথায় থাকবেন এবং দেশবাসীর কাছে তাঁর প্রত্যাশা কী।

​শেখ হাসিনা বলেন:

“ঢাকায় তো যেতেই হবে, কিন্তু সেখানে গিয়ে কোথায় উঠব জানি না। আমার আর কোনো ঘরবাড়ি বা বাসস্থান বাকি নেই। ধানমন্ডির বাড়ি বা স্বামীর বাড়ি—সবই ধ্বংস করা হয়েছে। গাছতলায় থাকব—উপরে আকাশ আছে, নিচে মাটি আছে, সেখানে থাকব। আকাশ আমার ছাদ হবে, মাটি আমার ঘর হবে। দেশবাসীর ভালোবাসা ও দোয়াই আমার একমাত্র সম্বল। তাদের মুখে হাসি ফোটাতে আমি জীবনপণ চেষ্টা চালিয়ে যাব।”

সংবাদটি শেয়ার করুন

আরও পড়ুন