বিদ্যুৎ খাতে উন্নয়ন হয়নি—টুকুর বক্তব্যের প্রতিবাদে বিপু, মনে করিয়ে দিলেন কানসাটের ১৭ প্রাণহানির ঘটনা
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে গত দেড় দশকে কোনো উন্নয়ন হয়নি—বর্তমান বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুর এমন বক্তব্যের সমালোচনা করেছেন সাবেক বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপু। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক দীর্ঘ পোস্টে তিনি বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিদ্যুৎ খাতের পরিস্থিতি এবং কানসাটে বিদ্যুতের দাবিতে আন্দোলনরত মানুষের ওপর গুলির ঘটনা স্মরণ করিয়ে দিয়ে টুকুর বক্তব্যের প্রতিবাদ জানান।
নসরুল হামিদ প্রশ্ন তুলেছেন,
একজন দায়িত্বশীল মন্ত্রী কীভাবে দেশের অর্থনৈতিক ইতিহাস এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের গত দেড় দশকের পরিবর্তন অস্বীকার করতে পারেন। তাঁর ভাষ্য, রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়ার আগে বর্তমান বিদ্যুৎমন্ত্রীর নিজের দায়িত্ব পালনকালের রেকর্ড পর্যালোচনা করা উচিত।
পোস্টে নসরুল হামিদ বলেন, ২০০৬ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার ক্ষমতা ছাড়ার সময় বাংলাদেশের অর্থনীতির আকার ছিল ৭১ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার এবং মাথাপিছু জিডিপি ছিল প্রায় ৪৯০ ডলার। অন্যদিকে, ২০২৪ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ সময়ে দেশের জিডিপি ৪৫০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যায় এবং মাথাপিছু আয় প্রায় ২ হাজার ৮০০ ডলারে পৌঁছায়।
বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৬ সালে বাংলাদেশের বর্তমান বাজারমূল্যে জিডিপি ছিল প্রায় ৭১ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার। ২০২৪ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ৪৫০ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলারে। তবে এই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পেছনে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের পাশাপাশি অন্যান্য খাতের অবদানও রয়েছে।
বিদ্যুৎ খাতের উন্নয়নকে অর্থনৈতিক অগ্রগতির ভিত্তি বললেন বিপু
নসরুল হামিদের দাবি, শেখ হাসিনার সরকার বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতকে অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচনা করেছিল। তাঁর ভাষায়, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে পারার কারণেই দেশে নতুন শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে, তৈরি পোশাকশিল্পের উৎপাদন ও রপ্তানি বেড়েছে এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের বিকাশ ঘটেছে।
তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ সরকার সারা দেশে শতভাগ বিদ্যুতায়ন নিশ্চিত করেছে, বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বহুগুণ বাড়িয়েছে এবং গ্যাসের উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানির মাধ্যমে শিল্প ও আবাসিক খাতে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করেছে।
বিদ্যুৎ বিভাগের তথ্যেও ২০০৯ থেকে ২০২২-২৩ অর্থবছরের মধ্যে বিদ্যুৎ খাতে সক্ষমতা বৃদ্ধির চিত্র পাওয়া যায়। বাংলাদেশ চায়না পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেডের (বিসিপিসিএল) বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, এ সময়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনকেন্দ্রের সংখ্যা ২৭ থেকে বেড়ে ১৫২ হয়েছে। ক্যাপটিভ ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিসহ স্থাপিত উৎপাদন সক্ষমতা ৪ হাজার ৯৪২ মেগাওয়াট থেকে বেড়ে ২৮ হাজার ১৩৪ মেগাওয়াটে পৌঁছায়। বিদ্যুৎ সুবিধার আওতায় আসা জনসংখ্যার হার ৪৭ শতাংশ থেকে বেড়ে ১০০ শতাংশ হয়।
তবে উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং বাস্তবে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ এক বিষয় নয়। বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন সক্ষমতা, জ্বালানির প্রাপ্যতা, বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রকৃত উৎপাদন এবং সঞ্চালন ও বিতরণব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা—সবকিছু মিলিয়েই সরবরাহ পরিস্থিতি নির্ধারিত হয়।
টুকুর দায়িত্ব পালনকালের বিদ্যুৎ সংকটের কথা স্মরণ করালেন বিপু
নসরুল হামিদের বক্তব্যের বড় অংশজুড়ে রয়েছে ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের বিদ্যুৎ খাতের পরিস্থিতি। তিনি উল্লেখ করেন, বর্তমান বিদ্যুৎমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু ওই সরকারের সময় বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্বে ছিলেন।
বিপুর অভিযোগ, ওই সময়ে দেশে ভয়াবহ বিদ্যুৎ সংকট ছিল। কোথাও কোথাও ১৬ থেকে ১৮ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং হতো। বিদ্যুতের দাবিতে সাধারণ মানুষকে রাস্তায় নামতে হয়েছিল। তিনি বিশেষভাবে স্মরণ করিয়ে দেন চাঁপাইনবাবগঞ্জের কানসাটে বিদ্যুতের দাবিতে আন্দোলন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গুলিতে মানুষের প্রাণহানির ঘটনা।
২০০৬ সালের কানসাট আন্দোলনের প্রাণহানির বিষয়টি সমসাময়িক সংবাদ প্রতিবেদন ও মানবাধিকার সংস্থার নথিতেও উঠে এসেছে। প্রথম আলো ২০২২ সালে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানায়, ওই বছরের জানুয়ারি থেকে শুরু হওয়া পাঁচ মাসের আন্দোলনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গুলিতে ১৭ জন প্রাণ হারান।
দ্য ডেইলি স্টারের ২০০৬ সালের ২৩ জানুয়ারির প্রতিবেদনে কানসাটে পুলিশের গুলিতে সাতজন নিহত ও শতাধিক আহত হওয়ার কথা বলা হয়। একই বছরের ৬ এপ্রিল প্রকাশিত আরেক প্রতিবেদনে জানানো হয়, ওই দিনের সংঘর্ষে তিনজন নিহত হন এবং জানুয়ারি থেকে কানসাট আন্দোলনে মোট প্রাণহানির সংখ্যা ১৩-তে পৌঁছায়। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের প্রতিবেদনেও ৪ ও ২৩ জানুয়ারির গুলির ঘটনায় প্রাণহানি ও আহত হওয়ার তথ্য নথিভুক্ত রয়েছে।
নসরুল হামিদ তাঁর পোস্টে কানসাটে প্রায় ৩০ জন নিহত হওয়ার কথা উল্লেখ করেছেন। তবে বিভিন্ন সমসাময়িক প্রতিবেদন ও পরবর্তী পর্যালোচনায় নিহতের সংখ্যা গণনার ক্ষেত্রে পার্থক্য রয়েছে।
বিপু আরও বলেন, ওই সময় বিদ্যুৎ উৎপাদন না বাড়িয়ে খাম্বা ব্যবসাকে কেন্দ্র করে যে বিতর্ক ও সমালোচনা তৈরি হয়েছিল, সেটিও মানুষের মনে রয়েছে। তাঁর মতে, যে সময়ে মানুষ বিদ্যুতের দাবিতে আন্দোলন করে প্রাণ হারিয়েছে, সেই সময়ের দায়িত্বশীল ব্যক্তি আজ বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে কোনো উন্নয়ন হয়নি বলে বক্তব্য দিলে তা বিস্ময়কর।
বর্তমান সংকট নিয়েও পাল্টাপাল্টি বক্তব্য
এদিকে বিদ্যুৎ খাত নিয়ে বর্তমান সরকারের বক্তব্যেও আগের সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্তের প্রভাবের বিষয়টি উঠে এসেছে। চলতি বছরের ২৬ ফেব্রুয়ারি বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু সাংবাদিকদের বলেছিলেন, আগের সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্তের ভুলের কারণে বিদ্যুৎ খাতে বিপুল ঋণের বোঝা তৈরি হয়েছে। তিনি বলেন, বিদ্যুৎ খাতে ব্যাপক ঋণ রয়েছে, অথচ বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর সুযোগও সীমিত।
অন্যদিকে, সাম্প্রতিক সময়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহ ঘাটতির বিষয়টিও সংসদে উঠে এসেছে। বিদ্যুৎমন্ত্রী জাতীয় সংসদে জানিয়েছেন, বিদ্যুতের পরিস্থিতির উন্নতি হলেও কিছু এলাকায় লোডশেডিং থাকবে। তাঁর দেওয়া তথ্যানুযায়ী, এক পর্যায়ে উৎপাদন ছিল ১৪ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট এবং চাহিদা ছিল ১৪ হাজার ৮৩৯ মেগাওয়াট।
অর্থাৎ, বিদ্যুৎ খাতের অতীতের উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি, আর্থিক দায় এবং বর্তমান সরবরাহ সংকট—তিনটি বিষয়ই এখন রাজনৈতিক বিতর্কের অংশ হয়ে উঠেছে।
‘উন্নয়নের ইতিহাস মুছে ফেলা যায় না’
নসরুল হামিদ তাঁর পোস্টে বর্তমান বিদ্যুৎমন্ত্রীকে উদ্দেশ করে বলেন, রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়ার আগে নিজের দায়িত্ব পালনকালের রেকর্ড একবার দেখে নেওয়া উচিত। শেখ হাসিনার সরকারের সময়ে কতগুলো গ্যাসকূপ খনন হয়েছে, কতটা বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বেড়েছে, কত মানুষ বিদ্যুৎ সুবিধার আওতায় এসেছে এবং কত শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে—এসব জানতে মন্ত্রণালয় ও পেট্রোবাংলার নথিপত্র পর্যালোচনার আহ্বান জানান তিনি।
পোস্টের শেষাংশে সাবেক এই প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘উন্নয়নের ইতিহাস মুছে ফেলা যায় না। আর নিজের অতীতের ব্যর্থতা আড়াল করতে গিয়ে অন্যের অর্জন অস্বীকার করলেই বাস্তবতা বদলে যায় না।’
তিনি আরও বলেন, দেশের মানুষ অতীত ও বর্তমান—দুই সময়ের পরিস্থিতিই দেখেছে। কে বিদ্যুৎ দিতে পেরেছে, আর কার শাসনামলে বিদ্যুতের দাবিতে আন্দোলনরত মানুষের ওপর গুলি চালানো হয়েছে, সেই হিসাব মানুষ ভুলে যায়নি।
নসরুল হামিদের এই বক্তব্যের বিষয়ে বিদ্যুৎমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুর কোনো পাল্টা প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।























