দারিদ্র নির্মূলে বিশ্বজুড়ে রোল মডেল বাংলাদেশ এখন খাদের দ্বারপ্রান্তে
অব্যাহত চড়া মূল্যস্ফীতি, প্রকৃত আয়ের নিম্নগতি এবং শোভন কর্মসংস্থানের অভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে সাধারণ মানুষের জনজীবন। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের আকাশচুম্বী দামের সঙ্গে মেলাতে না পেরে অর্ধেকের কাছাকাছি পরিবারকে এখন সংসার চালাতে হচ্ছে ধার-দেনা বা ঋণের ওপর ভর করে।
এর ফলে দারিদ্র্য বিমোচনে বিশ্বের দরবারে উদাহরণ সৃষ্টি করা বাংলাদেশ এখন যেন উল্টো পথে হাঁটতে শুরু করেছে।
একসময় দারিদ্র বিমোচনে ইতিহাস সৃষ্টি করে জাতিসংঘ, বিশ্বব্যাংক, আইএমএফসহ আন্তর্জাতিক সকল শীর্ষ সংস্থার কাছে রোল মডেল ছিল বাংলাদেশ, এখন সেই দেশই খাদের দ্বারপ্রান্তে উপনীত।
গ্রামীণ ও প্রান্তিক অঞ্চলের দিনমজুরদের কাজের সন্ধানে ছুটতে হচ্ছে এক জেলা থেকে অন্য জেলায়। কাঠফাটা রোদে অন্যের জমিতে কাজ করেও সংসারের ন্যূনতম খরচ মেটাতে পারছেন না দিনমজুর-খেটে খাওয়া মানুষ। তাদের আয়ের সিংহভাগই চলে যায় খাবারের পেছনে, ফলে অন্যান্য মৌলিক চাহিদা মেটাতে বছরের একটা বড় সময় ঋণের জালে আবদ্ধ থাকতে হচ্ছে তাদের।
একই চিত্র ফুটে উঠেছে চট্টগ্রামের পাহাড়তলীর গৃহিণী তাজকিরা বেগম জানান, দুই বছর আগেও পরিবার নিয়ে সচ্ছলভাবে চলেছেন। এখন অসুস্থ স্বামী ও সন্তানের চিকিৎসার খরচ চালাতে গিয়ে দেনাগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন। তার ভাষায়, “তিনবেলা খাবার জোগাড় করাই এখন বড় দুশ্চিন্তা।”
সংকট এখন কেবল গ্রামীণ প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, চরম অনিশ্চয়তায় পড়েছেন শহরের মধ্যবিত্ত ও সীমিত আয়ের মানুষও। সরকারি-বেসরকারি চাকরিজীবীদের আয় ও বেতন অপরিবর্তিত থাকলেও লাগামহীনভাবে বেড়েছে বাসাভাড়া, চিকিৎসা খরচ এবং পেঁয়াজ-রসুনের মতো দৈনন্দিন বাজার খরচ।
২০২৪-এর জুলাই-আগস্টের সংঘাতের পর প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেলে বেকার হয়ে পড়েন আব্দুর রশিদ হাওলাদার। জমিজমা বিক্রি করে পুরান ঢাকায় একটি দোকান নিয়েছেন। কিন্তু চাঁদাবাজি, সন্ত্রাসীদের উৎপাতে দোকানে বাকি পড়ে গেছে, এখন পুঁজি সংকটে পড়েছেন।
এছাড়া, শিক্ষিত অন্যান্য চাকুরিজীবীদের মতে, দুই বছর আগের বেতনে বর্তমান বাজারমূল্যে টিকে থাকা অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। ডিগ্রিধারী উচ্চশিক্ষিত হয়েও নিম্নমানের জীবনযাপন করতে বাধ্য হওয়ায় তরুণ সমাজের মধ্যে দেশ ছাড়ার প্রবণতা বাড়ছে।
আন্তর্জাতিক সংস্থা ও গবেষণার উদ্বেগজনক তথ্য
আন্তর্জাতিক সংস্থা ও দেশীয় বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সাম্প্রতিক উপাত্তে দেশের দারিদ্র্য পরিস্থিতি নিয়ে এক মারাত্মক উদ্বেগজনক চিত্র সামনে এসেছে:
বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস: চলমান অবস্থা অব্যাহত থাকলে চলতি বছরেই বাংলাদেশে নতুন করে প্রায় ২১ লাখ মানুষ নতুন করে দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যাবে।
পিপিআরসির জরিপ:দেশের প্রায় ৩ কোটি ১০ লাখ মানুষ বর্তমানে চরম দারিদ্র্যের ঝুঁকিতে রয়েছেন।
দারিদ্র্য সীমার চিত্র: গবেষণা অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশের উচ্চ দারিদ্র্য সীমার নিচে অবস্থান করছিল প্রায় ২৮ শতাংশ মানুষ।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মূল্যস্ফীতি, প্রকৃত মজুরি হ্রাস এবং নতুন ও মানসম্মত কাজের সুযোগ তৈরি না হওয়াকেই দারিদ্র্যের ঝুঁকি বৃদ্ধির মূল কারণ।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, দেশের মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি পেলেও যদি বৈষম্য সমান্তরালে বাড়ে, তবে সেই আয় বৃদ্ধির সুফল নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণি পর্যন্ত পৌঁছায় না। আর বৈষম্য বজায় রেখে কেবল স্থবির আয়ের ওপর ভর করে দারিদ্র্য বিমোচন করা কখনোই সম্ভব নয়।
অর্থনীতির দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা ও দুর্বল নীতিমালার প্রভাব এখন কাটছাঁট করা বাজারের ফর্দ ও সাধারণ মানুষের দিন যাপনের স্পষ্ট কষ্টে রূপ নিয়েছে।























