বিদেশিদের হাতে চট্টগ্রাম বন্দরের একের পর এক টার্মিনাল: ঝুঁকিতে রাজস্ব, কর্মসংস্থান ও কৌশলগত নিয়ন্ত্রণ

অথর
কুষ্টিয়া অনুসন্ধান নিউজ ডেক্স :   বাংলাদেশ
প্রকাশিত :7 October 2026, 5:08 PM | নিউজটি পড়া হয়েছে : 1 বার
বিদেশিদের হাতে চট্টগ্রাম বন্দরের একের পর এক টার্মিনাল: ঝুঁকিতে রাজস্ব, কর্মসংস্থান ও কৌশলগত নিয়ন্ত্রণ

দেশের অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর। বৈদেশিক বাণিজ্যের বড় অংশই এই বন্দরের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। অথচ সম্প্রতি বন্দরটিকে ঘিরে শুরু হয়েছে আলোচনা ও বিতর্ক। এরইমধ্যে দেখা গেছে, চট্টগ্রাম বন্দরের একের পর এক টার্মিনাল তুলে দেওয়া হচ্ছে বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে।

পতেঙ্গা কন্টেইনার টার্মিনাল দিয়ে শুরু; এখন নিউমুরিং কন্টেইনার টার্মিনাল (এনসিটি), চট্টগ্রাম কন্টেইনার টার্মিনাল (সিসিটি) এবং জেনারেল কার্গো বার্থের (জিসিবি) ক্ষেত্রেও বিদেশি অপারেটর নিয়োগের উদ্যোগ চলছে।

ক্ষমতাসীন সরকারের অজুহাত, বিদেশি বিনিয়োগের সঙ্গে উন্নত প্রযুক্তি যুক্ত হলে বন্দরের দক্ষতা বাড়বে।

তবে শ্রমিক সংগঠনগুলোর আশঙ্কা, এমন সিদ্ধান্ত জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও অর্থনীতির ওপর প্রভাব ফেলতে পারে, পাশাপাশি বহু মানুষের কর্মসংস্থানও হুমকির মুখে পড়তে পারে।

তাহলে বিষয়টির বাস্তব চিত্র কী? প্রস্তাবিত চুক্তিগুলোতে কী কী শর্ত রয়েছে, আর চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা কমিটি কেন আন্দোলনে নেমেছে? বিষয়টি নিয়ে পর্যালোচনা করা যাক।

বন্দরের কোন টার্মিনাল কার পরিচালনায়?
চট্টগ্রাম বন্দরে বর্তমানে চারটি প্রধান কন্টেইনার টার্মিনাল চালু আছে: এনসিটি, সিসিটি, জিসিবি এবং পতেঙ্গা কন্টেইনার টার্মিনাল (পিসিটি)। ২২ বছরের চুক্তির আওতায় পিসিটির পরিচালনার দায়িত্ব পায় সৌদি প্রতিষ্ঠান ‘রেড সি গেটওয়ে টার্মিনাল ইন্টারন্যাশনাল’ (আরএসজিটিআই)। প্রতিষ্ঠানটি এখন টার্মিনালটি পরিচালনা করছে।

এ ছাড়া ঢাকার কাছের পানগাঁও আইসিডি পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছে সুইজারল্যান্ডের ‘মেডলগ’। আর লালদিয়ার চরের দায়িত্ব ৩০ বছরের জন্য পেতে যাচ্ছে ডেনমার্কের ‘এপিএম টার্মিনালস’।

বন্দরটির সবচেয়ে ব্যস্ত ও গুরুত্বপূর্ণ টার্মিনাল হলো নিউমুরিং কন্টেইনার টার্মিনাল।

২০২৫ সালের হিসাব অনুযায়ী, বন্দরের মোট কন্টেইনার ব্যবস্থাপনার প্রায় ৪৪ শতাংশই হয় এই টার্মিনালে। সম্প্রতি জি-টু-জি ও পিপিপি কাঠামোর অধীনে টার্মিনালটি আধুনিকায়ন ও পরিচালনার জন্য দুবাইভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ‘ডিপি ওয়ার্ল্ড’-এর সঙ্গে ১৫ বছরের চুক্তির খসড়ায় অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।

এদিকে সিসিটি ও জিসিবির অপারেটর হওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছে সৌদি প্রতিষ্ঠান আরএসজিটিআই। এই প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যে চিঠি পাঠিয়েছে। ফলে বন্দরের প্রায় সব বড় টার্মিনালই কোনো না কোনো বিদেশি প্রতিষ্ঠানের পরিচালনায় দেওয়ার প্রক্রিয়ায় রয়েছে।

বিদেশি অপারেটর নিয়োগে সরকারের যুক্তি কী?
সরকার কেন বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোর দিকে ঝুঁকছে—এ প্রশ্নে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় ও বন্দর-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা দক্ষতা বৃদ্ধি এবং আধুনিকায়নের কথা বলছেন।

সরকারের ধারণা, আন্তর্জাতিক মানের অপারেটর যুক্ত হলে বন্দরে উন্নত প্রযুক্তি ও স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা চালু হবে। বর্তমানে জাহাজ থেকে কন্টেইনার খালাসে যে সময় লাগে, ডিপি ওয়ার্ল্ড বা আরএসজিটিআইয়ের মতো অভিজ্ঞ প্রতিষ্ঠান কাজ শুরু করলে জাহাজের অপেক্ষার সময়—অর্থাৎ ‘টার্নঅ্যারাউন্ড টাইম’—কমতে পারে।

তাতে আমদানি ও রপ্তানির খরচ কমবে এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতার সক্ষমতা বাড়বে। বিদেশি বিনিয়োগের বিনিময়ে রাষ্ট্র বড় অঙ্কের কনসেশন ফি ও রাজস্বও পেতে পারে বলে সরকারের প্রত্যাশা।

দেশি ও বিদেশি প্রস্তাবের আর্থিক হিসাব
এই সিদ্ধান্ত নিয়ে বিতর্কের বড় অংশ জুড়ে রয়েছে প্রস্তাবগুলোর আর্থিক তুলনা এবং অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর দর। বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ ও সিদ্ধান্তের বিরোধীরা বলছেন, এনসিটি পরিচালনার জন্য ডিপি ওয়ার্ল্ডের চেয়ে বেশি রাজস্ব দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিল দেশীয় ও বহুজাতিক কয়েকটি প্রতিষ্ঠান।

দুবাইভিত্তিক ডিপি ওয়ার্ল্ড কনসেশন ফি হিসেবে ২ কোটি ডলার দেওয়ার প্রস্তাব করে। বিপরীতে, দেশীয় বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান এমজিএইচ গ্রুপ ২ কোটি ৫০ লাখ ডলার দেওয়ার কথা জানায়।

প্রতি কন্টেইনারে ডিপি ওয়ার্ল্ডের প্রস্তাবের চেয়ে অন্তত ৫ ডলার বেশি রাজস্ব দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছিল প্রতিষ্ঠানটি।

দেশীয় তিন প্রতিষ্ঠানের জোট ‘সাইফ-কসমস-এভারেস্ট পোর্ট সার্ভিসেস’ অবশ্য ইজারা নিতে চায়নি; তারা শুধু টার্মিনাল পরিচালনার দায়িত্ব চেয়েছিল।

তাদের প্রস্তাব ছিল, কন্টেইনারপ্রতি ৯২ ডলার রাজস্ব দেওয়া হবে।

সংগ্রাম পরিষদের দাবি, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান চট্টগ্রাম ড্রাইডক লিমিটেড (সিডিডিএল) বর্তমানে সফলভাবে এনসিটি পরিচালনা করছে এবং বন্দরটির নিট আয়ও ভালো।

তাদের আশঙ্কা, এই অবস্থায় দীর্ঘমেয়াদি পরিচালনার দায়িত্ব বিদেশি রাষ্ট্রায়ত্ত বা বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের হাতে দিলে বাংলাদেশ বিপুল রাজস্ব হারাতে পারে। একই সঙ্গে অর্জিত মুনাফা দেশের বাইরে চলে যাওয়ার ঝুঁকিও থাকবে।

পাশাপাশি, দেশের অন্যতম প্রধান প্রবেশপথ চট্টগ্রাম বন্দরের মাধ্যমে সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা ঝুঁকির দিকটিও বিবেচনায় রাখার কথা বলছেন নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা।

শ্রমিকদের আন্দোলন ও জাতীয় নিরাপত্তার উদ্বেগ
সব টার্মিনালে বিদেশি অপারেটর নিয়োগের উদ্যোগের পর চট্টগ্রাম বন্দরের পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা কমিটি, স্কপ, জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলসহ বিভিন্ন সংগঠন ধারাবাহিকভাবে এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে কর্মসূচি পালন করছে।

শ্রমিক নেতাদের উদ্বেগ মূলত তিনটি বিষয়ে।

তাঁদের আশঙ্কা, বিদেশি অপারেটররা স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি চালু করলে স্থানীয় অনেক শ্রমিক চাকরি হারাতে পারেন। এ ছাড়া দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর পুরোপুরি বিদেশি পরিচালনায় গেলে ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি তৈরি হতে পারে এবং কৌশলগত নিয়ন্ত্রণ হারানোর আশঙ্কাও বাড়তে পারে।

স্পর্শকাতর এ ধরনের চুক্তির আগে পূর্ণাঙ্গ ও স্বচ্ছ আর্থিক এবং কারিগরি মূল্যায়ন জনসমক্ষে প্রকাশ করা উচিত ছিল বলেও শ্রমিক নেতারা দাবি করছেন।

এই পরিস্থিতিতে শ্রমিক নেতারা হুঁশিয়ারি দিয়েছেন: সরকার আন্দোলনরত শ্রমিকদের সঙ্গে আলোচনা না করে একতরফাভাবে চুক্তি সই করলে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে কুতুবদিয়ার বহির্নোঙর পর্যন্ত বন্দরের কার্যক্রম অচল করে দেওয়া হবে।

সামনে কী হতে পারে?
আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের গতির সঙ্গে তাল মেলাতে চট্টগ্রাম বন্দরের আধুনিকায়ন এবং সক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন—এ নিয়ে সন্দেহ নেই। কিন্তু সেই উন্নয়ন যেন দেশের অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব, শ্রমিকদের স্বার্থ কিংবা জাতীয় রাজস্বকে ঝুঁকিতে না ফেলে, তা নিশ্চিত করাই সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ।

এখন দেখার বিষয়, আন্দোলনরত শ্রমিক নেতাদের সঙ্গে আলোচনায় বসে সরকার সিদ্ধান্তটি পুনর্বিবেচনা করবে, নাকি দেশের অর্থনীতির এই গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তির পরিচালনার দায়িত্ব বিদেশি অপারেটরদের হাতে দেবে।

চট্টগ্রাম বন্দরে বিদেশি অপারেটর নিয়োগ কি উন্নয়নের নতুন সুযোগ তৈরি করবে, নাকি স্থানীয় ব্যবস্থাপনাকে আরও শক্তিশালী করার পথেই এগোনো সম্ভব ছিল?

সংবাদটি শেয়ার করুন

আরও পড়ুন