রক্তের প্রয়োজন, আছেন সুমন
এক নারীর অস্ত্রোপচার হবে। জরুরি রক্তের প্রয়োজন। এ কথা জানার পর রক্তদাতার খোঁজে নামেন সুমন রাফি। ঘটনা ২০০৮ সালের। তখন তিনি ফরিদপুর রাজেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে অর্থনীতিতে স্নাতক (সম্মান) করছেন। পরিচিত আর সহপাঠীর কাছে ছুটছেন, একে একে জিজ্ঞেস করছেন কার কী রক্তের গ্রুপ। এক পর্যায়ে পেয়ে যান কাঙ্ক্ষিত সেই দাতার সন্ধান। তাঁকে নিয়ে ছোটেন ক্লিনিকে, যেখানে তাঁর এক বন্ধুর আত্মীয়ের জীবন ছিল সংকটাপন্ন। রক্তের জোগান হলো। অস্ত্রোপচারও সফল হলো। ধীরে সুস্থ হয়ে ওঠেন সেই নারী। মুখে তাঁর ফুটে ওঠে এক অনাবিল হাসি।
আর এ ঘটনা সুমন রাফির মনে গভীর দাগ কাটে। ভাবেন, কীভাবে গায়ের তাজা রক্ত দিয়ে মানুষের কল্যাণ করা যায়। এই ভাবনাই ধীরে ধীরে হয়ে উঠেছে তাঁর জীবনের অংশ। এখন পর্যন্ত প্রায় ১০ হাজার ব্যাগ রক্ত সংগ্রহ করে দিয়েছেন তিনি। নিজে রক্ত দিয়েছেন ৪০ ব্যাগ।
অবশ্য অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর তাগিদ আরও অনেক আগেই অনুভব করেন সুমন রাফি। ২০০২ সালে এক প্রতিবেশী এতিম শিশুর জীবন বাঁচাতে সহযোগিতা দেন। এর পর ধীরে ধীরে শতাধিক অসহায় পরিবারকে দিয়েছেন আর্থিক সহায়তা। পরিবেশ রক্ষায়ও তৎপর তিনি। প্রায় ২০ হাজার গাছের চারা রোপণ করেছেন।
তাঁর পুরো নাম মো. হেদায়েতুর রাফি (৩৯)। তবে বেশি পরিচিত সুমন রাফি নামে। বাড়ি ফরিদপুরের বোয়ালমারী উপজেলার ছোলনা গ্রামে। কারও রক্তের প্রয়োজন কিংবা কোনো পরিবারের আর্থিক সংকটের খবর পেলে সাধ্যমতো সহযোগিতা করেন। তাঁর মানবিক কাজের পরিধি ছড়িয়ে পড়েছে পাশের আলফাডাঙ্গা উপজেলায়ও।
খবর পেলেই এগিয়ে যান তিনি
পরিচিত-অপরিচিত কারও রক্তের প্রয়োজনের খবর পেলেই এগিয়ে আসার চেষ্টা করেন সুমন রাফি। নিজে রক্ত দেওয়া ছাড়াও রোগীর স্বজনের সঙ্গে রক্তদাতাদের যোগাযোগ করিয়ে দেন। প্রয়োজনীয় রক্তের গ্রুপের দাতা খুঁজে বের করা এবং তাদের হাসপাতালে পৌঁছানোর বিষয়ে সমন্বয় করেন। অনেক সময় রাতেও এমন প্রয়োজনে ফোন আসে। চেষ্টা করেন দ্রুত সাড়া দিতে।
রক্তের ব্যবস্থা করতে গিয়ে সব সময় যে সহজে সফল হওয়া যায়, তা নয়। কখনও নির্দিষ্ট রক্তের গ্রুপের দাতা পাওয়া যায় না, কখনও দূরে অবস্থান করায় সময়মতো হাসপাতালে পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়ে। এসব পরিস্থিতিতে সম্ভাব্য দাতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে সমাধানের চেষ্টা করেন তিনি। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এ পর্যন্ত প্রায় ১০ হাজার ব্যাগ রক্ত সংগ্রহ করে দিয়েছেন।
আলফাডাঙ্গা উপজেলার পানাইল গ্রামের শারীরিক প্রতিবন্ধী রিক্তা বলেন, ‘অসুস্থতার কারণে আমার জরুরি রক্তের প্রয়োজন হয়। রক্তের সন্ধানে ফেসবুকে একটি পোস্ট দেওয়া হলে বিষয়টি নজরে আসে সুমন রাফির। তিনি আমার জন্য পরপর তিন ব্যাগ বি পজিটিভ রক্তের ব্যবস্থা করে দেন। এ জন্য আমি তাঁর কাছে কৃতজ্ঞ।’
সুমন রাফি বলেন, ‘রক্তদানের চেয়ে বড় সেবা আর হয় না। আমার শরীরের রক্ত এমনিতেই তিন মাস পরপর মারা যায়। তাই নিজে রক্ত দান করি। অন্যদেরও উৎসাহিত করি। এরই মধ্যে আমাদের একটি নেটওয়ার্ক তৈরি হয়েছে। এর আওতায় অনেকে স্বেচ্ছায় রক্ত দেন।’ তিনি আরও বলেন, ‘২০১৮ সালের একটি ঘটনা এখনও আমার মনে আছে। খবর পাই, এক প্রসূতির অস্ত্রোপচার হবে। তার জরুরি রক্তের প্রয়োজন। এর আগে আমি রক্ত দিয়েছি। তখন তিন মাস পার হয়নি। তাৎক্ষণিক দাতা না পেয়ে রাত আড়াইটায় আমি নিজেই বোয়ালমারীর একটি প্রাইভেট ক্লিনিকে হাজির হই। এক ব্যাগ রক্ত দিই। অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে ওই প্রসূতির সন্তান হয়। যাক, আমার সামান্য রক্তে মা ও নবজাতক সুস্থ আছেন, এটি ভেবে আমার অনেক ভালো লাগে।’
আর্থিক সংকটেও সহযোগিতার হাত
রক্তের প্রয়োজন মেটানোর পাশাপাশি আর্থিক সংকটে থাকা মানুষের পাশে দাঁড়ানোও সুমন রাফির মানবিক কাজের অংশ। এ পর্যন্ত শতাধিক পরিবারকে সহায়তা করেছেন তিনি। কারও চিকিৎসার খরচ, কারও সন্তানের পড়াশোনা, আবার কারও নিত্যপ্রয়োজনীয় খাবার কেনার জন্য সামর্থ্য অনুযায়ী অর্থ বা প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র দিয়ে সহযোগিতা করেছেন।
শুরু হয় ২০০২ সালে। প্রতিবেশী এক নবজাতক, যে জন্মের আগেই হারিয়েছে তার বাবাকে। তখন তার মা সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা। এতিম সেই শিশু জন্মের পর ভুগতে থাকে নানা শারীরিক জটিলতায়। একে তো কাঁদে, তার ওপর বমি করে। এমনকি মায়ের বুকের দুধও সে পেটে ধরে রাখতে পারে না। এই নবজাতককে নিয়ে মা পড়েন অকূলপাথারে। একে তো স্বামী হারানোর কাঁচা শোক, তার ওপর ছোট্ট শিশুটি রোগা-পটকা। চিকিৎসা করানোর সামর্থ্য নেই। সুমন রাফি তখন এসএসসি পরীক্ষার্থী। নিজের মা-বাবার কাছ থেকে টাকা নিয়ে এই পরিবারটির পাশে দাঁড়ান। দুই বছর পর শিশুটির অস্ত্রোপচার করা হয়। তখনও আর্থিক সহযোগিতা দেন।
কোনো পরিবারের প্রয়োজন অনুযায়ী একা সহায়তা করা সম্ভব না হলে পরিচিতজন ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের কাছে সহযোগিতা চান সুমন রাফি। কেউ অর্থ দেন, কেউ ওষুধ বা খাবার দিয়ে পাশে দাঁড়ান। এভাবে অন্যদেরও মানবিক কাজে যুক্ত করার চেষ্টা করেন তিনি।
আলফাডাঙ্গা সদর বাজারের চা দোকানি রিনিয়া বেগম বলেন, ‘আমি কয়েক বছর ধরে শারীরিক অসুস্থতায় ভুগছিলাম। চিকিৎসার জন্য প্রতি মাসে প্রায় দেড় হাজার টাকার ওষুধ লাগত। আমার অসুস্থতার খবর পেয়ে সুমন ভাই আসেন। তিনি টানা কয়েক মাস আমাকে ওষুধ কিনে দেন। আমি ধীরে ধীরে সুস্থ হই। তাঁর এই সাহায্যের কথা আমি কখনও ভুলব না।’
আলফাডাঙ্গার বুড়াইচ গ্রামের বিধবা আছিয়া বেগমের অসহায়ত্বের কথা শুনে তাঁর পাশে দাঁড়ান মানবিক মানুষ সুমন রাফি। আছিয়া বেগম বলেন, ‘আমাকে কাপড় ও খাদ্যসামগ্রী কিনে দেন। নগদ টাকাও দেন। এতে আমার খুব উপকার হয়।’
কাজ করছেন পরিবেশ রক্ষায়ও
মানুষের পাশে দাঁড়ানোর পাশাপাশি পরিবেশ রক্ষায়ও কাজ করছেন সুমন রাফি। তিনি বলেন, ২০০৪ সাল থেকে বিভিন্ন স্থানে প্রায় ২০ হাজার গাছের চারা রোপণ করেছেন। তাঁর কাছে বৃক্ষরোপণ শুধু গাছের চারা লাগানোর কাজ নয়; ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বাসযোগ্য পরিবেশ গড়ে তোলারও একটি উপায়। গাছ লাগানোর পাশাপাশি সেগুলোর পরিচর্যার প্রয়োজনীয়তার কথাও মনে করেন তিনি।
বোয়ালমারী ও আলফাডাঙ্গা উপজেলার বিভিন্ন গ্রামীণ সড়কের পাশে ফলদ ও বনজ গাছের চারা রোপণ করেন। এর মাধ্যমে পরিবেশ রক্ষা, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য বৃদ্ধি এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সবুজ ও বাসযোগ্য পরিবেশ গড়ে তোলাই তাঁর মূল লক্ষ্য। ব্যক্তিগত উদ্যোগে দীর্ঘদিন ধরে তাঁর এই বৃক্ষরোপণ কার্যক্রম স্থানীয়ভাবে পরিবেশবান্ধব উদ্যোগের একটি দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে।
সুমন রাফি বলেন, ‘আমি বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গিয়ে কথা বলি। তাদের পছন্দ অনুযায়ী আম, জাম, কাঁঠাল লিচু, মেহগনি, নিম, আমলকীসহ নানা জাতের গাছের চারা কিনে দিই। এ ছাড়া সরকারি সড়কের পাশে নিজের পছন্দমতো কৃষ্ণচূড়া, সেগুনসহ নানা গাছের চারা রোপণ করি। যেদিন কৃষ্ণচূড়ার টকটকে লাল ফুল ফুটবে, পথিকরা আনন্দ পাবে। এটিই আমার পাওনা।’
স্বজনরা প্রবাসী, তিনি থেকে যেতে চান পাড়াগাঁয়ে
সুমন রাফি অর্থনীতিতে স্নাতক (সম্মান) এবং মার্কেটিংয়ে এমবিএ করেছেন। তাঁর মা-বাবা, দুই ভাই ও এক বোন যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করেন। আত্মীয়স্বজনের মধ্যে অন্তত ২২ জন প্রবাসে। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা নিয়েছেন তিনিও। সময় করে ঘুরতে যাবেন; মা-বাবা ও ভাইবোনের সঙ্গে কিছুদিন কাটাবেন। এরপর ফিরে আসবেন এই পাড়াগাঁয়ে। তিনি বলেন, ‘আমাদের পারিবারিক ব্যবসা আছে। সহায়-সম্পত্তিও আছে। চাইলে আমিও প্রবাসী হতে পারি। কিন্তু এই মাটি, মানুষ আমার ভালো লাগে। আমি থেকে যেতে চাই এখানে। মানুষের কল্যাণে কিছু করে যেতে চাই।’
মানুষের প্রতি ছোটবেলা থেকেই সুমন রাফির এই দরদের কথা ভালো করেই জানেন পরিবারের সদস্যরা। তারা নানাভাবে উৎসাহ দেন; সর্বাত্মক সহযোগিতা দেন।
সুমন রাফির কাছে মানুষের পাশে দাঁড়ানো কোনো প্রচারের বিষয় নয়; বরং ব্যক্তিগত বিশ্বাস ও দায়িত্ববোধের অংশ। একটি শিশুর জন্য রক্তের ব্যবস্থা করতে গিয়ে যে কাজের শুরু, তা এখন রক্ত সংগ্রহ, আর্থিক সহায়তা ও বৃক্ষরোপণের মতো নানা উদ্যোগে বিস্তৃত হয়েছে।
তাঁর এই পথচলা দেখায়, মানুষের উপকার করতে সব সময় বড় সামর্থ্যের প্রয়োজন হয় না। আন্তরিকতা ও সদিচ্ছা থাকলে ছোট একটি উদ্যোগও অনেকের জীবনে স্বস্তি এনে দিতে পারে। রক্তের প্রয়োজনের সময় একজন দাতার সন্ধান দেওয়া যেমন একটি পরিবারকে আশ্বস্ত করতে পারে, তেমনি সংকটে থাকা পরিবারের পাশে দাঁড়ানো কিংবা একটি গাছ লাগানোও সমাজের জন্য ইতিবাচক অবদান।
যে প্রাপ্তি তুলনাহীন
সুমন রাফি বলেন, জীবনের অর্থ একেকজনের কাছে একেক রকম। আমি মানুষের ভালোবাসাকে পরম প্রাপ্তি মনে করি। আজকাল প্রায়ই এমন হয়, কোনো একটি প্রত্যন্ত গ্রামে গেলাম। একজন এসে সালাম দিলেন, নাম ধরে জানতে চাইলেন কেমন আছি। লোকটা বললেন, ‘চিনতে পারছেন না, ওই যে হাসপাতালে আমার বউকে রক্ত দিয়েছিলেন। চলেন, আমাদের বাড়িতে চলেন।’ তখন আমার মনে হয়, এই জীবনে এর চেয়ে মূল্যবান আর কী পাওয়ার আছে! ‘আজকাল অনেকে আমার বাড়িতে আসেন। উপহার হিসেবে নিয়ে আসেন নিজেদের গাছের পেঁপে, কলাসহ নানা ফল। এই পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ উপহার। আমি একজীবনে আর কিছু চাই না।’ যোগ করেন তিনি।
সুমন রাফির প্রত্যাশা, আরও অনেক মানুষ স্বেচ্ছায় রক্তদানে এগিয়ে আসবেন, বিশেষ করে কোনো প্রসূতি যেন জরুরি প্রয়োজনে রক্তের অভাবে কষ্ট না পান। তরুণরা অসহায় মানুষের সহযোগিতা এবং পরিবেশ রক্ষার কাজ করবেন। মানুষের ছোট ছোট উদ্যোগ একসঙ্গে এভাবে বড় পরিবর্তনের পথ সৃষ্টি করবে। আজকের কৃষ্ণচূড়ার চারা একদিন বিশাল আকৃতির বৃক্ষ হবে। টকটকে লাল ফুল ফুটবে। মানুষের মন কৃষ্ণচূড়ার মতো রঙিন হবে।























