শ্রমিকদের উপর হামলার ভিডিও করায় পিটিয়ে শ্রমিকহত্যা; এই মৃত্যুর দায়ও আওয়ামীলীগের উপর চাপালো সরকার
পোশাক শ্রমিকদের ওপর হামলার দৃশ্য মোবাইল ফোনে ধারণ করছিলেন তৌফিক, এই অভিযোগে হামলাকারীরা ফোন কেড়ে নিয়ে তাঁকে পিটিয়ে গুরুতর আহত করে। মৃত্যুর পরও ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্তের বদলে রাজনৈতিক বক্তব্যে আর বিচার না করে সরকারের দায় এড়ানো নিয়ে উঠেছে প্রশ্ন।
গাজীপুরে পোশাকশ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির আন্দোলন ঘিরে সহিংসতায় আহত শ্রমিক মোঃ তৌফিক হোসেন এর মৃত্যু হয়েছে। আন্দোলন চলাকালে শ্রমিকদের ওপর হামলার দৃশ্য মোবাইল ফোনে ধারণ করার সময় তিনি হামলার শিকার হন বলে তাঁর পরিবারের সদস্য ও স্থানীয় সূত্রের বরাতে সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে। গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি করার পর মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়।
শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত তৌফিক হোসেন সিকদারবাড়ী, গাজীপুর সদর, গাজীপুর এ অবস্থতি শতভাগ রপ্তানিমুখী প্রতিষ্ঠান লায়লা স্টিচেস লিঃ একজন শ্রমিক ছিলেন। তিনি ২০২২ সালে লে-ম্যান হিসাবে এই পোশাক প্রস্তুতকারী কারখানায় কাজ শুরু করেন।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, তৌফিকের বড় ভাই হারুন মিয়া জানিয়েছেন, সোমবার আন্দোলনের সময় হামলার ঘটনা ভিডিও করার চেষ্টা করছিলেন তাঁর ভাই। এ সময় হামলাকারীরা তাঁর ওপর চড়াও হয়ে বেধড়ক মারধর করে। পরে তাঁকে হাসপাতালে নেওয়া হয়।
নিহত তৌফিকের মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের উপার্জনক্ষম সদস্যকে হারানোর ঘটনা নয়; শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি আদায়ের আন্দোলনে সহিংসতা, হামলাকারীদের রাজনৈতিক পরিচয় এবং ঘটনার পর সরকারের বক্তব্যের ধরন নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন তৈরি করেছে।
প্রধানমন্ত্রীর ডেপুটি প্রেস সেক্রেটারি সুজন মাহমুদ তৌফিকের হত্যার দায় আওয়ামীলীগের উপর চাপিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পোস্ট দেন। সময়ঃ ৪ঠা নভেম্বর রাত ০০ঃ৫৬মিঃ
হামলাকারীদের পরিচয় আড়াল করে আন্দোলনকে রাজনৈতিক রং দেওয়ার চেষ্টা?
প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাতে পাওয়া তথ্যে অভিযোগ করা হয়েছে, শ্রমিকদের ওপর হামলার সময় তৌফিক মোবাইল ফোনে পুরো ঘটনা ধারণ করছিলেন। এ সময় যুবদলের কয়েকজন নেতাকর্মী বা তাদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা তাঁর মোবাইল ফোন কেড়ে নেন এবং তাঁকে উপর্যুপরি মারধর করেন। গুরুতর আহত তৌফিককে পরে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়।
অন্যদিকে, শ্রমিক আন্দোলনের শুরু থেকেই আন্দোলনকে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠার একটি প্রবণতা দেখা যাচ্ছে ।
গত দুই দিন ধরে মিরপুর ও গাজীপুরসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে শতাধিক শ্রমিককে আটক করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে অনেককে নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের সদস্য হিসেবে সংবাদমাধ্যমের সামনে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়েছে। সমালোচকদের প্রশ্ন, শ্রমিকদের বেতন-ভাতা ও ন্যূনতম মজুরির দাবিতে শুরু হওয়া আন্দোলনে রাজনৈতিক পরিচয় সামনে আনার প্রয়োজন কতটুকু? এর মাধ্যমে কি শ্রমিকদের প্রকৃত দাবিগুলো আড়াল করে আন্দোলনের দায় আওয়ামী লীগের ওপর চাপানোর চেষ্টা করা হচ্ছে?
গাজীপুরে শ্রমিক আন্দোলনের ভিডিও ধারণ করতে গিয়ে বিএনপির হামলায় প্রাণ গেল তৌফিকের
তৌফিকের মৃত্যু নিয়েও একই রাজনৈতিক বয়ান
তৌফিকের মৃত্যুর পর সরকারের পক্ষ থেকে দেওয়া বক্তব্যেও একই ধরনের রাজনৈতিক প্রবণতা দেখা গেছে বলে সমালোচনা তৈরি হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর ডেপুটি প্রেস সেক্রেটারি সুজন মাহমুদ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে লিখেছেন,
“শ্রমিক আন্দোলন যে আর শ্রমিকদের মধ্যে নেই তৌফিকের মৃত্যুর ঘটনা সেটির প্রমাণ করে। দেশকে অশান্ত করতে আওয়ামী দুর্বৃত্তরা চক্রান্ত শুরু করেছে। পোষাক শ্রমিক ভাই-বোনেরা আপনারাই শেষে আওয়ামীলীগের বলি হলেন।আর আন্দোলনকারীরা যদি পোষাক শ্রমিকে হতো,তাইলে তারা আরেক পোষাক শ্রমিকের ওপর কিভাবে হামলা করে মেরে ফেলে!”
তাঁর এই বক্তব্যে তৌফিকের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগের সম্পৃক্ততার অভিযোগ তোলা হলেও কারা তাঁকে মারধর করেছে, কেন তাঁর ওপর হামলা হয়েছে এবং হামলাকারীদের রাজনৈতিক পরিচয় কী—এসব মৌলিক প্রশ্নের কোনো সুনির্দিষ্ট উত্তর পাওয়া যায়নি।
এখানে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হচ্ছে, একজন শ্রমিক হামলার দৃশ্য ভিডিও করার কারণে হামলার শিকার হয়ে মারা গেলে সেটিকে কীভাবে পুরো শ্রমিক আন্দোলন আওয়ামী লীগের ষড়যন্ত্রের প্রমাণ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা যায়?
তৌফিকের হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে আওয়ামী লীগের কোনো ব্যক্তি বা সংগঠনের সম্পৃক্ততা থাকলে তদন্তের মাধ্যমে তা প্রমাণ করতে হবে। একইভাবে ছাত্রদল, যুবদল কিংবা অন্য কোনো রাজনৈতিক সংগঠনের সদস্যরা জড়িত থাকলেও তাঁদের পরিচয় ও দায় আড়াল করার সুযোগ নেই।
রাজনৈতিক বক্তব্য তদন্তের বিকল্প হতে পারে না।

অথচ আন্দোলনের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত শ্রমিকদের মূল দাবিগুলোর বিষয়ে কার্যকর ও বিশ্বাসযোগ্য সমাধানের চেয়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র এবং আওয়ামী লীগের সম্পৃক্ততার বিষয়গুলোই বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে বলে সমালোচনা রয়েছে।
সরকারের পক্ষ থেকে মজুরি বোর্ড গঠনের কথা বলা হলেও শ্রমিকদের প্রত্যাশিত মজুরি, বাস্তবায়নের সময়সীমা এবং তাঁদের জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বেতন কাঠামো নিয়ে সুস্পষ্ট আশ্বাস কতটা দেওয়া হয়েছে, সেই প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
একদিকে লাখ লাখ শ্রমিকের জীবন-জীবিকা ও ন্যায্য মজুরির প্রশ্ন, অন্যদিকে আন্দোলনকে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা—এই দুইয়ের মধ্যে মূল সমস্যাটিই যেন আড়ালে পড়ে যাচ্ছে।
একদিকে সরকার তৌফিকের মৃত্যুকে আড়াল করার চেষ্টা করছে, অন্যদিকে নিহত শ্রমিককে নিয়েই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব ছড়াচ্ছে বিএনপি।























