অর্থনীতির বেহাল দশা, মানুষের পেটে ভাত নেই: একে একে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে দেশের অনেক শপিং মল

অথর
কুষ্টিয়া অনুসন্ধান নিউজ ডেক্স :   বাংলাদেশ
প্রকাশিত :1 November 2026, 7:32 PM | নিউজটি পড়া হয়েছে : 6 বার
অর্থনীতির বেহাল দশা, মানুষের পেটে ভাত নেই: একে একে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে দেশের অনেক শপিং মল

একসময় রাজধানীর অভিজাত শপিং মল হিসেবে পরিচিত ছিল ইস্টার্ন প্লাজা। চলন্ত সিঁড়ি, লিফট এবং ক্রেতাদের প্রয়োজনীয় নানা পণ্য একই জায়গায় পাওয়ার সুবিধায় বিপণিবিতানটি সারা দেশে পরিচিতি পেয়েছিল। টেলিভিশনেও এর বিজ্ঞাপন প্রচারিত হতো। কিন্তু গত এক দশকে সেই চিত্র পাল্টেছে। এখন ক্রেতার ভিড় নেই, দোকানগুলোতেও আগের মতো উপচে পড়া সমাগম দেখা যায় না।

হাতিরপুলের এই বিপণিবিতানের দুরবস্থার পেছনে ঢাকায় আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন নতুন শপিং মলের সংখ্যা বেড়ে যাওয়াকে কারণ হিসেবে দেখছেন ব্যবসায়ীরা। তাঁদের মতে, অনলাইনে কেনাকাটার জনপ্রিয়তা বাড়াতেও ইস্টার্ন প্লাজার জৌলুশ কমেছে।

গতকাল সন্ধ্যায় শপিং মলটি ঘুরে দেখা যায়, নিচতলায় প্রসাধনী, খেলাধুলার সামগ্রী ও পোশাকের দোকান থাকলেও ক্রেতা হাতে গোনা। অনেক দোকানের কর্মীরা মোবাইল ফোনে সময় কাটাচ্ছিলেন, কেউ কেউ গল্প করছিলেন।

বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অনলাইনভিত্তিক ব্যবসা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শপিং মলে ক্রেতার সংখ্যা কমেছে। বিক্রি কমে যাওয়ায় কেউ কেউ ব্যবসা বদলেছেন, আবার অনেকে ক্রেতা টানতে ও বিক্রি বাড়াতে কৌশল পাল্টেছেন।

তবে এসব উদ্যোগেও ক্রেতা ও বিক্রির পরিমাণ খুব একটা বাড়ছে না বলে তাঁদের অভিমত।

মলের বিভিন্ন তলা ঘুরে দেখা গেছে, ওপরের দিকে অনেক দোকানের শাটার নামানো। বেশ কিছু দোকান খালি পড়ে আছে; কোনো কোনো ব্যবসায়ী জায়গা ছেড়ে চলে গেছেন।

তবে ক্রেতা কমে যাওয়ার সমস্যা শুধু ইস্টার্ন প্লাজার নয়। রাজধানীর অন্তত ১০টি পুরোনো ও অভিজাত শপিং মলে সরেজমিনে ঘুরে দেখা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ইস্টার্ন মল্লিকা, পুলিশ প্লাজা, রাপা প্লাজা, সীমান্ত স্কয়ার, হোসাফ টাওয়ার, মৌচাক মার্কেট এবং মিরপুর-১০-এর শাহ আলী মার্কেট। প্রায় প্রতিটি বিপণিবিতানেই ক্রেতার আনাগোনা কম দেখা গেছে।

ব্যবসায়ীরা বড় অঙ্কের লোকসানের কথা জানিয়েছেন। দোকানভাড়া ও কর্মচারীদের বেতন জোগাড় করতেও তাঁদের হিমশিম খেতে হচ্ছে।

ক্রেতার অভাবে সম্প্রতি বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে শান্তিনগরের একসময়ের অভিজাত বিপণিবিতান কর্ণফুলী গার্ডেন সিটি শপিং কমপ্লেক্স। গত শতকের শেষ দিকে কাকরাইলে চালু হওয়া এই বিপণিবিতানে জামা-কাপড়, জুতা, প্রসাধনী ও গয়না কিনতে মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত ক্রেতাদের ভিড় হতো।

সময়ের সঙ্গে নানা কারণে ক্রেতা হারাতে হারাতে সেখানে বেচাকেনা এতটাই কমে যায় যে দোকানমালিকেরা শেষ পর্যন্ত পুরো কমপ্লেক্সটি বন্ধ করতে বাধ্য হন।

১৯৯৮ সালে নির্মিত ২০ তলা ভবনের বেজমেন্ট ও চারটি তলা নিয়ে কর্ণফুলী গার্ডেন সিটি চালু হয়েছিল। ভবনের অন্য তলাগুলো ছিল অ্যাপার্টমেন্ট। বিপণিবিতান বন্ধ হওয়ার পাশাপাশি মালিকানাধীন দোকান থাকা অনেক ব্যবসায়ী তাঁদের দোকান বিক্রির সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

বিভিন্ন শপিং মলের ব্যবসায়ী ও দোকানমালিক সমিতির সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মল বন্ধের সময়সীমা আগের চেয়ে এগিয়ে আনা এবং রাজধানীতে একাধিক আধুনিক ও বড় শপিং মল গড়ে ওঠায় পুরোনো বিপণিবিতানগুলোতে মানুষের যাতায়াত কমেছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে অনলাইনে কেনাকাটার দিকে ক্রেতাদের ঝোঁক। বর্তমান মূল্যস্ফীতিও বিক্রি কমার পেছনে কিছুটা ভূমিকা রাখছে বলে মনে করেন ব্যবসায়ীরা।

বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সভাপতি মো. হেলাল উদ্দিন বলেন, ‘শপিং মলগুলোতে ক্রেতা ও বিক্রি কমে যাওয়ার মূল কারণ মূলত সময়সীমা কমিয়ে আনা। শপিং মলগুলোর বিক্রির পিক টাইম সন্ধ্যাবেলা। কিন্তু এসব মল খোলা রাখার সময়সীমা রাত ৮টা পর্যন্ত, যে কারণে ক্রেতা কমে যাচ্ছে। এর বাইরে আরো একটি কারণ হলো মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়া। আমরা দোকান খোলা রাখার সময়সীমা আরো ১ ঘণ্টা বাড়ানোর জন্য সরকারের সঙ্গে আলোচনা করছি। তাতে অন্তত ক্রেতা সমাগম মার্কেটগুলোতে বাড়লে ব্যবসায়ীরা টিকে থাকতে পারবেন।’

ব্যবসায়ীরা জানালেন, দেশে ব্যবসার মন্দা চলছে। অনেক কল-কারখানা বন্ধ, কর্মহীন হয়ে পড়েছেন সাধারণ মানুষ। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে অনেকের হাতেই মাস শেষে জমা তো থাকে না- উল্টো ঋণ হচ্ছে। পেটে ভাত জোগাতে পারছেন না, কেনাকাটায় তাই ভাটা পড়েছে।

এলিফ্যান্ট রোডের ইস্টার্ন মল্লিকা শপিং কমপ্লেক্সও একসময় পোশাক ও শাড়ি, বিয়ের সামগ্রী, প্রসাধনী এবং তুলনামূলক সাশ্রয়ী দামের পণ্যের জন্য ক্রেতাদের আকর্ষণ করত। সেখানেও আগের তুলনায় ক্রেতার ভিড় অনেক কম। দোকানিরা মনে করেন, মল খোলা রাখার সময় কমিয়ে দেওয়াও এর একটি কারণ।

দোকানগুলো ঘুরে দেখা গেছে, ক্রেতা খুব বেশি নেই। বিক্রি কমে যাওয়ার কারণ জানতে চাইলে নিচতলার কালার কসমেটিকসের বিক্রেতা নুসাইবা বলেন, ‘বেচাবিক্রি তেমন নেই। এর একটি বড় কারণ দ্রুত মার্কেট বন্ধ হয়ে যাওয়া। আগে দেখা যেত, চাকরিজীবীরা বাসায় গিয়ে ৮টার দিকে মার্কেটে এসে ১০টা পর্যন্ত কেনাকাটা করতেন। কিন্তু এখন ৮টায় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ক্রেতা পাচ্ছি না।’

ইস্টার্ন মল্লিকার আরেক দোকানি জানান, আগের মতো লাভ না হলেও ঈদসহ বিভিন্ন উৎসব ও বিশেষ দিনে তাঁদের বিক্রি ভালো থাকে। বছরের বাকি সময়কে তাঁরা অফ সিজন হিসেবে দেখেন। সে সময় দোকানিরা মূলত ভাড়া ও কর্মচারীদের বেতন মেটানোর মতো বিক্রি করার চেষ্টা করেন।

মৌচাক ও শান্তিনগরের শপিং মলগুলোতেও ক্রেতার অভাব দেখা যাচ্ছে। একসময় মানুষের পদচারণে সরগরম থাকা দীর্ঘ করিডোর এখন অনেকটাই ফাঁকা। কেন্দ্রীয় শীতাতপনিয়ন্ত্রিত আধুনিক মল থেকে পুরোনো মার্কেট—সবখানেই বিক্রি কমেছে। দোকানিদের মতে, মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ায় নিত্যপণ্য কেনাই কঠিন হয়ে পড়েছে।

তাই মানুষ পোশাক, প্রসাধনী ও জুতার মতো পণ্যে খরচ কমাচ্ছেন। বিক্রি কমে যাওয়ায় ব্যবসায়ীরা দোকানভাড়া ও পরিচালন ব্যয় মেটাতেও সমস্যায় পড়েছেন।

মৌচাক এলাকার ফরচুন শপিংয়ে গতকাল বিকেল চারটার দিকে গিয়ে দেখা যায়, পোশাক ও জুতার দোকানগুলোতে ক্রেতা প্রায় নেই। বিক্রয়কর্মীদের কেউ মোবাইল ফোন দেখছিলেন, কেউ গল্প করে সময় কাটাচ্ছিলেন।

ফরচুন শপিংয়ের একটি জুতার দোকানের বিক্রয়কর্মী জানান, আগে মাসে তিন থেকে পাঁচ লাখ টাকার বেশি বিক্রি হতো। এখন বিক্রি নেমে এসেছে তার অর্ধেকেরও নিচে। কোনো কোনো দিন একটিও পণ্য বিক্রি হয় না।

একই মলের এসডি কসমেটিকস কর্নারের বিক্রয়কর্মী মনির হোসেন বলেন, ‘আমদানি করা যেসব পণ্যের দাম আগে ১ হাজার টাকা ছিল, সেগুলোর দাম এখন ১ হাজার ৪০০ টাকা। এর সঙ্গে সামান্য মুনাফা যোগ করতেই দাম অনেক বেড়ে যায়। পাশাপাশি বিদ্যুৎ বিল, দোকান ভাড়া ও সার্ভিস চার্জও বাড়ছে। পণ্যের সঙ্গে এসব ব্যয় যুক্ত হলে অনেক বেশি দাম পড়ে যাচ্ছে। ক্রেতারা দাম শুনলেই কেনার ইচ্ছা হারিয়ে ফেলেন।’

মৌচাকের হোসাফ টাওয়ার শপিং কমপ্লেক্সেও বিক্রি কমে যাওয়ায় ক্রেতার উপস্থিতি ছিল খুবই কম। নিচতলার বেশির ভাগ দোকান বন্ধ দেখা গেছে, আর দোতলার করিডোরে ক্রেতা প্রায় ছিল না বললেই চলে। কেন্দ্রীয় শীতাতপনিয়ন্ত্রণ ও চলন্ত সিঁড়ি বন্ধ থাকায় মলের ভেতরে চলাচল অস্বস্তিকর হয়ে উঠেছে বলে জানান জননী ক্লথ স্টোরের স্বত্বাধিকারী মোফাজ্জল হোসেন শরীফ। তাঁর ভাষ্য, বিক্রি অর্ধেকেরও নিচে নেমে গেছে; কোনো কোনো দিন একটি সুতাও বিক্রি হয় না।

মৌচাক মার্কেটের রাজ ফ্যাব্রিকসের বিক্রয়কর্মী সাইফুল ইসলামও বিক্রির মন্দার কথা জানান। তাঁর মতে, পূজার সময়ে কিছুটা বিক্রি হলেও বর্তমানে বেচাকেনা নেই। মানুষের আয়ের বড় অংশ খাবার কেনায় চলে যাচ্ছে। এ কারণে পোশাক, প্রসাধনী ও গয়না অনেকের কাছে বিলাসী পণ্যে পরিণত হয়েছে।

টুইন টাওয়ার শপিং মল, রাজিয়া শপিং মল, আয়েশা শপিং কমপ্লেক্স ও মেজবাহ উদ্দিন প্লাজাতেও একই ধরনের ক্রেতাসংকট দেখা গেছে। সেখানে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীরা আর্থিক চাপে পড়েছেন।

একসময় সাপ্তাহিক ছুটির দিনে হাতিরঝিলের পাশে গুলশানের পুলিশ প্লাজা কনকর্ডে ক্রেতাদের ভিড় জমত। বিশেষ করে শুক্র ও শনিবারে অন্য দিনের তুলনায় বিক্রি অনেক বেশি হতো। এখন সেই চিত্র নেই। সেখানকার ব্যবসায়ীরা বলছেন, পাঁচ বছর আগের তুলনায় বিক্রি প্রায় ৬০ শতাংশ কমেছে। তাঁদের কেউ কেউ মনে করেন, বর্তমান পরিস্থিতি করোনাকালের চেয়েও খারাপ।

গতকাল পুলিশ প্লাজা ঘুরে দেখা যায়, বিভিন্ন তলার দোকান খোলা থাকলেও ক্রেতা তুলনামূলকভাবে কম। পোশাক, জুতা ও ফ্যাশনসামগ্রীর দোকানে নানা ধরনের ছাড় ও অফার চলছিল। তবু অধিকাংশ দোকানে এক-দুজনের বেশি ক্রেতা দেখা যায়নি।

পুলিশ প্লাজার ব্যবসায়ীদের মতে, সাপ্তাহিক ছুটির দিনেও এখন অনেকে কেনাকাটার চেয়ে ঘোরাঘুরি ও বিনোদনের জন্য মলে আসেন। মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়া, পণ্যের দাম বৃদ্ধি এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিক্রিকে প্রভাবিত করছে।

ক্রেতাদের অনেকে বিক্রি কমার অন্য কারণের কথাও বলেছেন। তাঁদের মতে, সরাসরি মলে গিয়ে কেনাকাটার পাশাপাশি অনলাইনে কেনার প্রবণতা বেড়েছে। পুলিশ প্লাজায় কেনাকাটা করতে আসা নুসরাত জাহান বলেন, অনলাইন প্ল্যাটফর্মে পণ্যের দাম ও ছাড় অনেক সময় বেশি আকর্ষণীয় থাকে। তাই অনেকে এখন সরাসরি শপিং মলে যান না, আর আগের মতো ভিড়ও চোখে পড়ে না।

রাজধানীর ব্যস্ত বাণিজ্যিক এলাকাগুলোর একটি মিরপুর-১০। কয়েক দিন আগেও এখানকার শপিং মল ঘিরে ফুটপাতের বাজার জমজমাট থাকত। সিটি করপোরেশন ফুটপাতের দোকান উচ্ছেদ করায় ক্রেতারা মলের দিকে ফিরবেন—এমন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে ফ্যাশন ও কাপড়, ক্রোকারিজ, গয়না—প্রায় সব ধরনের দোকানেই ক্রেতার সংকট রয়েছে।

শাহ আলী প্লাজার নিচতলার মাহিম ক্রোকারিজ গার্ডেনে এক নারী চাকরিজীবীকে ১ হাজার ৬৫০ টাকার পণ্য কিনতে দেখা যায়। দোকানটির স্বত্বাধিকারী মো. জসীম উদ্দিন জানান, সকাল থেকে ওইটুকুই বিক্রি হয়েছে। বিক্রির প্রমাণ হিসেবে তিনি প্রতিবেদককে নিজের লেজারবইও দেখান।

প্লাজার তৃতীয় তলার বোম্বে কালেকশনের মালিক মো. মঈন উদ্দিন ২০০৩ সাল থেকে ব্যবসা করছেন। তিনি বলেন, ‘ব্যবসায়িক জীবনে বেচাকেনার এমন দুরবস্থা আর দেখেননি। কয়েক মাস ধরে বিক্রি নেই বললেই চলে। অথচ মাসে প্রায় ১৪ হাজার টাকা বিদ্যুৎ বিল দিতে হয়। এর সঙ্গে দোকান ভাড়া ও কর্মচারীদের খরচ রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে ব্যবসা ছেড়ে দেয়ার উপক্রম হয়েছে।’

মিরপুরের পরিচিত বেনারশী পল্লীতেও একই অবস্থা। শাড়ি ও বস্ত্রের জন্য জনপ্রিয় এ এলাকার দোকানগুলোতে ক্রেতার আনাগোনা খুবই কম। বেনারশী পল্লীর প্রবেশপথের রেসা বেনারশীর বিক্রয় প্রতিনিধি মো. সোহাগ বলেন, ‘দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে মানুষ কেনাকাটা কমিয়ে দিয়েছে। সাপ্তাহিক ছুটির দিনে তুলনামূলক বেশি ক্রেতা আসার কথা থাকলেও এখনো বিক্রির খাতা খুলতে পারিনি।’

সংবাদটি শেয়ার করুন