গার্মেন্টস শ্রমিক আন্দোলন ধামাচাপা দিতে শ্রমিক বিক্ষোভে ছাত্রলীগ খুঁজছে সরকার ও মিডিয়া!

অথর
কুষ্টিয়া অনুসন্ধান নিউজ ডেক্স :   বাংলাদেশ
প্রকাশিত :1 November 2026, 8:49 PM | নিউজটি পড়া হয়েছে : 6 বার
গার্মেন্টস শ্রমিক আন্দোলন ধামাচাপা দিতে শ্রমিক বিক্ষোভে ছাত্রলীগ খুঁজছে সরকার ও মিডিয়া!

ঢাকার মিরপুরসহ বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে পোশাকশ্রমিকদের বিক্ষোভ ও আন্দোলনের মধ্যে নতুন করে সামনে এসেছে রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার প্রশ্ন। শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধি ও অন্যান্য দাবিতে শুরু হওয়া আন্দোলনকে কেন্দ্র করে সরকার ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বক্তব্যে এখন গুরুত্ব পাচ্ছে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের সম্পৃক্ততার অভিযোগ। এতে শ্রমিকদের প্রকৃত দাবিদাওয়া আড়ালে পড়ে আন্দোলনকে রাজনৈতিকভাবে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা হচ্ছে কি না, সেই প্রশ্নও উঠছে।

প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সহকারী রাশেদ খান অভিযোগ করেছেন, কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ এবং নিষিদ্ধ ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা পোশাকশ্রমিক পরিচয়ে আন্দোলনে নেমেছে। তাঁর দাবি, শ্রমিকদের আন্দোলনে আগে থেকেই উসকানি দিয়ে আসছিল জামায়াত ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)।

তবে শ্রমিকদের বিক্ষোভে রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের উপস্থিতি থাকলেই আন্দোলনের মূল দাবিগুলো রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রে পরিণত হয় না। দেশের লাখ লাখ পোশাকশ্রমিকের অনেকেই বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত। রাজনৈতিক পরিচয়ের পাশাপাশি তাঁদের শ্রমিক পরিচয় ও জীবিকার বাস্তবতাও রয়েছে। ফলে কোনো শ্রমিকের রাজনৈতিক পরিচয় সামনে এনে তাঁর মজুরি ও কর্মপরিবেশসংক্রান্ত দাবিকে উপেক্ষা করা কতটা যৌক্তিক, তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

সাজবুলের পরিচয় ঘিরে প্রশ্ন

এই বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সাজবুল ইসলাম। বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে তাঁকে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়েছে। তাঁর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট ও ভিডিওতে শ্রমিক আন্দোলনে অংশ নেওয়া এবং বিভিন্ন স্লোগান দেওয়ার বিষয়টিও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

 

কিন্তু তাঁর রাজনৈতিক পরিচয়ের পাশাপাশি ব্যক্তিগত ও কর্মজীবনের পরিচয়টিও আলোচনায় আসা প্রয়োজন। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, সাজবুল বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার পাশাপাশি নিজের সংসার ও শিক্ষার ব্যয় নির্বাহের জন্য মিরপুরের একটি পোশাক কারখানায় লাইনম্যান হিসেবে কাজ করেন। অর্থাৎ তিনি একই সঙ্গে একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী, রাজনৈতিক সংগঠনের সাবেক বা বর্তমান পদধারী এবং পোশাকশ্রমিক হতে পারেন।

এখানে একটি মৌলিক প্রশ্ন রয়েছে:

বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করা কোনো শিক্ষার্থী কি জীবিকার প্রয়োজনে গার্মেন্টসে কাজ করতে পারেন না? ছাত্রলীগের সঙ্গে তাঁর রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা থাকলে কি তাঁর শ্রমিক পরিচয় বাতিল হয়ে যায়? একজন শ্রমিকের রাজনৈতিক পরিচয় থাকলেই কি তাঁর মজুরি বৃদ্ধির দাবি অযৌক্তিক হয়ে পড়ে?

 

গ্রেপ্তার ও নাশকতার অভিযোগ

১ নভেম্বর দুপুরে ডিবির মিরপুর বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ রাকিব খান জানান, শ্রমিক আন্দোলনকে পুঁজি করে নাশকতার চেষ্টা চালানোর অভিযোগে ১১ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ ও যুবলীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মী।

তবে গ্রেপ্তার হওয়া ১১ জনের বিরুদ্ধে পুলিশের অভিযোগ এবং সামগ্রিক শ্রমিক আন্দোলনের দাবিদাওয়াকে এক করে দেখার সুযোগ নেই। নাশকতায় কারও সম্পৃক্ততা থাকলে তার বিরুদ্ধে তদন্ত ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে প্রকৃত শ্রমিকদের মজুরি ও কর্মপরিবেশের দাবির বিষয়টিও আলাদাভাবে বিবেচনা করতে হবে।

 

শ্রমিকদের দাবির জায়গায় রাজনৈতিক বিতর্ক কেন?

মিরপুরে ১ নভেম্বরের আন্দোলনে শ্রমিকদের প্রধান দাবি ছিল মাসিক ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণ। আগের দিনও মিরপুর, আশুলিয়া ও গাজীপুরের বিভিন্ন এলাকায় একই দাবিতে সড়ক অবরোধ করেন পোশাকশ্রমিকেরা। শ্রমিক অসন্তোষের কারণে আশুলিয়া ও গাজীপুরের প্রায় ৫০টি কারখানা এবং মিরপুরের প্রায় সব কারখানা বন্ধ রাখতে হয়েছিল।

শ্রমিকদের আন্দোলনের মধ্যে সংঘর্ষ, ভাঙচুর ও পুলিশের গাড়িতে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া জরুরি। কিন্তু বিচ্ছিন্ন নাশকতার অভিযোগ দিয়ে পুরো শ্রমিক আন্দোলনের বৈধতা প্রশ্নবিদ্ধ করা হলে শ্রমিকদের প্রকৃত সমস্যাগুলো আড়ালে থেকে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সহকারী রাশেদ খানের বক্তব্যে শ্রমিক আন্দোলনের সঙ্গে আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ, জামায়াত ও এনসিপির সম্পৃক্ততার অভিযোগ গুরুত্ব পেয়েছে। বিশেষ করে সারজিস আলমের শ্রমিক আন্দোলনের প্রতি সংহতি প্রকাশের পোস্টকে তিনি রাজনৈতিক পক্ষগুলোর যোগসাজশের প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরেছেন। তবে রাজনৈতিক সংহতি প্রকাশ এবং সহিংসতা বা নাশকতায় অংশগ্রহণ এক বিষয় নয়।

অন্যদিকে, শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী শ্রমিকদের মজুরি নির্ধারণে নতুন মজুরি বোর্ড গঠনের কথা জানিয়েছেন। ফলে শ্রমিকদের দাবির বাস্তবতা এবং আন্দোলন ঘিরে রাজনৈতিক ও আইনশৃঙ্খলাজনিত অভিযোগ—দুটি বিষয়ই সমান্তরালে বিবেচনার দাবি রাখে।

 

রাজনৈতিক পরিচয় নয়, শ্রমিকের দাবিও আলোচনায় আসুক

একজন পোশাকশ্রমিক আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামায়াত, এনসিপি কিংবা ছাত্রলীগের সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারেন। রাজনৈতিক পরিচয় তাঁর ব্যক্তিগত ও সাংগঠনিক পরিচয়ের অংশ। কিন্তু সেই পরিচয়ের কারণে তাঁর শ্রমিক পরিচয় মুছে যায় না। একইভাবে রাজনৈতিক পরিচয়ের আড়ালে কেউ নাশকতা করলে সেটিও তদন্তের বাইরে থাকার সুযোগ নেই।

সাজবুল ইসলামকে ঘিরে বিতর্ক তাই শুধু একজন শিক্ষার্থীর রাজনৈতিক পরিচয়ের প্রশ্ন নয়; এটি শ্রমিক আন্দোলনকে কীভাবে দেখা হচ্ছে, সেই প্রশ্নও সামনে এনেছে।

সরকারের দায়িত্ব হওয়া উচিত শ্রমিকদের প্রকৃত দাবি শোনা, ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করা এবং আন্দোলনের নামে সংঘটিত অপরাধের নিরপেক্ষ তদন্ত করা। শ্রমিকদের আন্দোলনে কারা রাজনৈতিকভাবে যুক্ত, সেটি তদন্তের বিষয় হতে পারে; কিন্তু সেই অনুসন্ধান যেন শ্রমিকদের জীবন-জীবিকা ও মজুরির প্রশ্নকে আড়াল করার বিকল্প হয়ে না দাঁড়ায়।

কারণ, একজন শ্রমিকের রাজনৈতিক পরিচয় থাকতে পারে, ছাত্র পরিচয় থাকতে পারে, আবার একই সঙ্গে তাঁর ন্যায্য মজুরি চাওয়ার অধিকারও থাকতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন