টঙ্গীতে দেশের শীর্ষস্থানীয় ওষুধ কারখানা পুড়ে ছাই: মার্কিন ওষুধ-চুক্তির সাথে একসূত্রে গাঁথা? প্রশ্ন কর্মচারীদের

অথর
কুষ্টিয়া অনুসন্ধান নিউজ ডেক্স :   বাংলাদেশ
প্রকাশিত :14 October 2026, 5:42 PM | নিউজটি পড়া হয়েছে : 1 বার
টঙ্গীতে দেশের শীর্ষস্থানীয় ওষুধ কারখানা পুড়ে ছাই: মার্কিন ওষুধ-চুক্তির সাথে একসূত্রে গাঁথা? প্রশ্ন কর্মচারীদের

টঙ্গীর চেরাগআলীতে ‘ড্রাগ ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড’-এর ওষুধ কারখানায় লাগা আগুন প্রায় পৌনে চার ঘণ্টার চেষ্টায় নিয়ন্ত্রণে এনেছে ফায়ার সার্ভিস।

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের মিডিয়া সেলের কর্মকর্তা মো. তালহা বিন জসিম জানান, বুধবার সকাল ১০টা ১০ মিনিটে কারখানাটিতে আগুন লাগার খবর পান তারা। এরপর ফায়ার সার্ভিসের ২০টি ইউনিট পর্যায়ক্রমে ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নেভানোর কাজে যোগ দেয়। পরে সেনাবাহিনী ও বিজিবিও অগ্নিনির্বাপণে সহায়তা করে।

সব পক্ষের চেষ্টায় বেলা ১টা ৫৫ মিনিটে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে বলে জানায় ফায়ার সার্ভিস। তবে ওই সময়ও আগুন সম্পূর্ণ নেভানো সম্ভব হয়নি।

ভয়াবহ এই অগ্নিকাণ্ডকে নাশকতা বলে দাবি করেছেন কর্মরত অনেক কর্মচারী।

তাদের ভাষ্য, বাংলাদেশের ওষুধ উৎপাদনে বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ দেশ, ১৪০টি দেশে রপ্তানি হয় বাংলাদেশি ওষুধ, মানের দিক থেকেও বাংলাদেশি ওষুধ সেরা। এই বিশাল বাজার ধ্বংসে নিশ্চয় চক্রান্ত করা হচ্ছে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বাংলাদেশের পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি (Agreement on Reciprocal Trade) এবং সাম্প্রতিক বাণিজ্য নীতির আওতায় ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জাম সংক্রান্ত এমন কিছু পয়েন্ট রয়েছে, যেখানে বাংলাদেশের স্বার্থ ক্ষুণ্ন হতে পারে বলে বিশেষজ্ঞদের অভিমত।

পয়েন্টগুলো নিচে তুলে ধরা হয়েছে
এসব কারণে ‘ড্রাগ ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড’-এর ওষুধ কারখানার অগ্নিকাণ্ডকে স্বাভাবিক বলে মনে করছেন না প্রতিষ্ঠানটির কর্মচারীরা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অনেক কর্মচারীই একে মার্কিন চক্রান্ত বলে দাবি করেন।

গাজীপুর শিল্পাঞ্চল পুলিশের সুপার মো. আমজাদ হোসেন জানান, ড্রাগ ইন্টারন্যাশনালের কারখানাটি ফার্মাসিউটিক্যালস শ্রেণির। সেখানে ৩৮৫ জন শ্রমিক কাজ করেন।

দুপুর পর্যন্ত এ ঘটনায় কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। কারখানার ভেতরে কেউ আটকা পড়েছেন কি না, তা-ও নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

ফায়ার সার্ভিসের কর্মীদের ভাষ্য অনুযায়ী, কারখানার দ্বিতীয় ইউনিটের পাঁচতলা ভবনের চতুর্থ তলা থেকে আগুনের সূত্রপাত। সেখান থেকে আগুন দ্রুত কারখানার বিভিন্ন অংশে ছড়িয়ে পড়ে। দূর থেকেও কারখানার ওপর আকাশে ধোঁয়ার কুণ্ডলী উঠতে দেখা যায়। আগুনের প্রচণ্ড তাপ ও রাসায়নিকের ঝাঁঝালো গন্ধে আশপাশের পরিবেশ অস্বস্তিকর হয়ে ওঠে।

কারখানার ভেতরে রাসায়নিক ও নানা শিল্পজাত উপকরণ থাকায় আগুন নেভানোর কাজ জটিল হয়ে পড়ে। টঙ্গী ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তাদের ধারণা, ইস্পাত ও অ্যালুমিনিয়ামে তৈরি ভবনের বিভিন্ন অংশে কাচ থাকায় আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে।

আগুন লাগার পর কারখানার ভেতরের পানির ব্যবস্থা কাজে লাগিয়ে তা নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু একপর্যায়ে পানির সংকট দেখা দেয়। পরে গাজীপুর, টঙ্গী, উত্তরা ও আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে পানিবাহী গাড়ি এনে আগুন নেভানোর চেষ্টা চালান ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা।

ফায়ার সার্ভিসের এক কর্মী জানান, আগুনের উৎস খুঁজে বের করতে এবং ভবনের ভেতরের আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে ফায়ার ফাইটাররা ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু প্রচণ্ড তাপ, ঘন ধোঁয়া ও রাসায়নিকের গন্ধের কারণে তাদের কাজ কঠিন হয়ে পড়ে।

কারখানাটিতে কীভাবে আগুন লেগেছে এবং এতে কী পরিমাণ আর্থিক ক্ষতি হয়েছে, তা তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি। তবে কারখানার ভেতরে থাকা ওষুধ, ওষুধ তৈরির উপকরণ ও যন্ত্রপাতি আগুনে পুড়ে গেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

কারখানার মালিক ডা. মো. আমজাদ হোসেনের সঙ্গে টেলিফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়।

ঘটনাস্থলে সেনাবাহিনী, বিজিবি, শিল্প পুলিশ ও থানা পুলিশের সদস্যরা দায়িত্ব পালন করছেন।

মার্কিন বাণিজ্য চুক্তির ওষুধ সংক্রান্ত ধারাগুলো বাংলাদেশের ওষুধ-শিল্পের জন্য যে ভয়াবহ ঝুঁকি তৈরি করতে পারে
পেটেন্ট ফি ও লাইসেন্সের খরচ বাড়বে: এলডিসি হিসেবে পাওয়া ছাড় সীমিত বা বাতিল হলে দেশীয় কোম্পানিগুলোকে নির্দিষ্ট ওষুধের কাঁচামাল বা উপাদানের পেটেন্ট ফি ও লাইসেন্সের জন্য অর্থ দিতে হতে পারে। এতে উৎপাদন ব্যয় বাড়বে।
সস্তায় জেনেরিক ওষুধ তৈরি কঠিন হবে: বাংলাদেশের ওষুধশিল্প এলডিসি-সুবিধার আওতায় পেটেন্ট ছাড় নিয়ে জেনেরিক ওষুধ তৈরি করে বিকশিত হয়েছে। কঠোর মেধাস্বত্ব প্রয়োগ এই উৎপাদন মডেলকে চাপে ফেলতে পারে।
ছোট ওষুধ কোম্পানিগুলো টিকে থাকার সংকটে পড়তে পারে: দেশে ১৮২টি কোম্পানির বেশির ভাগের পক্ষে বাড়তি পেটেন্ট ফি দেওয়া কঠিন হলে বাজার থেকে সরে যেতে হতে পারে। ফলে বাধ্য হবে ওষুধের দাম বাড়াতে।
শিল্পে প্রতিযোগিতা কমে যেতে পারে: ছোট কোম্পানিগুলো দুর্বল হলে বাজারের বড় অংশ হাতে গোনা কয়েকটি বড় বা বহুজাতিক কোম্পানির নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
কিছু ওষুধের দাম বাড়তে পারে: গবেষণা অনুযায়ী, পেটেন্ট ফি দিতে হলে দেশে উৎপাদিত ইনসুলিনের দাম ১১ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। কেমোথেরাপি, ক্যানসার ও হেপাটাইটিস সি–র ওষুধের দামও বাড়ার আশঙ্কা উল্লেখ করা হয়েছে।
জেনেরিক ওষুধের দাম ব্যাপকভাবে বাড়ার ঝুঁকি আছে: দুর্বল বাজার-নজরদারি ও প্রশাসনিক প্রস্তুতির অভাবে জেনেরিক ওষুধের দাম অনেক বেড়ে যেতে পারে—সর্বোচ্চ ১,০০০ শতাংশ বৃদ্ধির সম্ভাবনার রয়েছে।
ওষুধ দুষ্প্রাপ্য হতে পারে: পেটেন্ট-সংক্রান্ত বাধা বা বাড়তি উৎপাদন ব্যয়ের কারণে কিছু ওষুধ বাজারে কম পাওয়া যেতে পারে; এমনকি দাম বেশি দিয়েও তা সংগ্রহ করা কঠিন হতে পারে।
রোগীদের চিকিৎসা ব্যয় বাড়বে: ওষুধের দাম বাড়লে রোগীদের নিজেদের পকেট থেকে চিকিৎসার জন্য আরও বেশি অর্থ দিতে হবে। ২০ টাকার জেনেরিক ওষুধের দাম ৫০০ টাকা হওয়ার ঝুঁকি উল্লেখ করা হয়েছে।
জনস্বাস্থ্য ও ওষুধে প্রবেশাধিকার ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে: সুলভ ওষুধ কম পাওয়া বা নাগালের বাইরে চলে গেলে বিশেষ করে দীর্ঘমেয়াদি ও গুরুতর রোগে আক্রান্ত মানুষের চিকিৎসা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
দেশীয় উৎপাদন ও রপ্তানির সক্ষমতা চাপে পড়তে পারে: দেশীয় শিল্প দেশের প্রায় ৯৭ শতাংশ ওষুধের চাহিদা মেটায় এবং ১০০টি দেশে রপ্তানি করে। পেটেন্ট ব্যয় ও আইনি বাধা বাড়লে এই উৎপাদন ও রপ্তানি সক্ষমতা দুর্বল হতে পারে।
আমদানি ও কাস্টমস পর্যায়ে জটিলতা বাড়তে পারে: কোন কাঁচামালের পেটেন্ট আছে বা নেই, কিংবা কোনো আমদানিতে মেধাস্বত্ব লঙ্ঘিত হয়েছে কি না—তা নির্ধারণ জটিল। কাস্টমসকে এ দায়িত্ব দেওয়া হলে ভুল শনাক্তকরণ, পণ্য আটকে যাওয়া বা উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
আইনি অনিশ্চয়তা ও মামলা বাড়তে পারে: পেটেন্ট নির্ধারণে দক্ষ জনবল ও আইনগত সক্ষমতার ঘাটতির রয়েছে বাংলাদেশে। সেই প্রস্তুতি ছাড়া কঠোর প্রয়োগ হলে দেশীয় কোম্পানিগুলো দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল আইনি লড়াইয়ে জড়াতে পারে।
জাতীয় নীতি নির্ধারণের স্বাধীনতা সংকুচিত হতে পারে: দ্বিপক্ষীয় চুক্তির বাধ্যবাধকতা এলডিসি-সুবিধা ব্যবহারের সুযোগ ও ওষুধ খাতে জনস্বার্থভিত্তিক নীতি নেওয়ার স্বাধীনতাকে সীমিত করতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

আরও পড়ুন