যা দেখছেন চোখের সামনে, পর্দার পেছনের বাস্তবতা কেমন – সেটা কি জানেন?

অথর
কুষ্টিয়া অনুসন্ধান নিউজ ডেক্স :   বাংলাদেশ
প্রকাশিত :14 October 2026, 5:41 PM | নিউজটি পড়া হয়েছে : 1 বার
যা দেখছেন চোখের সামনে, পর্দার পেছনের বাস্তবতা কেমন – সেটা কি জানেন?

কয়েক দিন আগে আমরা জানতে পারলাম, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশ থেকে ওষুধ আমদানিতে শুল্কছাড় দিয়েছে। অর্থাৎ, আমরা এখন আরও বেশি ওষুধ রপ্তানি করব আমেরিকায়। নিঃসন্দেহে আনন্দদায়ক সংবাদ!

কিন্তু আসুন, এবার একটু দেখি গত দুই বছরে বাংলাদেশের ওষুধশিল্প কী ধরনের সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে এবং কীভাবে এই গুরুত্বপূর্ণ শিল্প খাতটি ক্রমেই আরও বেশি বিপর্যয়ের মুখে পড়ছে।

প্রথমে দেখা যাক ওষুধ কারখানায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাগুলো।

১) ২৮ ডিসেম্বর ২০২৪ — ব্রিস্টল ফার্মা লিমিটেড, কোনাবাড়ী, গাজীপুর। রাসায়নিক পদার্থের ড্রামে আগুন ও বিস্ফোরণে চার শ্রমিক দগ্ধ হন।

২) ১৯ অক্টোবর ২০২৫ — ইনসেপ্‌টা ফার্মাসিউটিক্যালস, ধামরাই। কারখানার সার্ভিস এলাকায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে।

৩) ১৬ মার্চ ২০২৬ — অপসোনিন ফার্মাসিউটিক্যালস, বরিশাল। রূপাতলীর গ্লোবাল ক্যাপসুল কারখানায় আগুন লাগে।

৪) ১৪ অক্টোবর ২০২৬ — ড্রাগ ইন্টারন্যাশনাল, টঙ্গী, গাজীপুর। চেরাগ আলী এলাকায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) প্রতিবেদন অনুযায়ী, আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে ফায়ার সার্ভিসের ১৬টি ইউনিট কাজ করে।

এগুলো কেবল অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা। এবার দেখা যাক, ওষুধ ও ওষুধের কাঁচামাল উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাওয়ার খবরগুলো।

১) ১৫ জুলাই ২০২৫ — লিব্রা ইনফিউশনস লিমিটেড, মিরপুর। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) পরিদর্শনে প্রতিষ্ঠানটির প্রধান কার্যালয় ও স্যালাইন উৎপাদন কারখানা বন্ধ পাওয়া যায়। প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক সংকটের তথ্যও প্রকাশিত হয়েছে।

২) ২৫ জুন ২০২৬ — অ্যাকটিভ ফাইন কেমিক্যালস লিমিটেড। ডিএসইর পরিদর্শনে ওষুধের কাঁচামাল (API) উৎপাদন সম্পূর্ণ বন্ধ পাওয়া যায়।

৩) ৯ জুলাই ২০২৬ — এএফসি অ্যাগ্রো বায়োটেক লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানটির বায়োফার্মাসিউটিক্যাল ও বায়োকেমিক্যাল উৎপাদন কারখানা বন্ধ পাওয়া যায়।

৪) ২৯ জুলাই ২০২৬ — গণস্বাস্থ্য বেসিক কেমিক্যাল লিমিটেড। গ্যাসসংকটের কারণে প্যারাসিটামলের কাঁচামাল উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাওয়ার খবর প্রকাশিত হয়।

এখানেই শেষ নয়।

১২ অক্টোবর ২০২৬-এ প্রকাশিত দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের প্রতিবেদন অনুযায়ী, স্কয়ার, বেক্সিমকো, অপসোনিন, ওএসএল, এসেনশিয়াল ড্রাগস ও পপুলার ফার্মার মতো প্রতিষ্ঠানে স্যালাইন উৎপাদন স্থগিত বা কমানো হয়েছে।
বাংলাদেশ ওষুধ শিল্প সমিতি জানিয়েছে, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং ওষুধের নিয়ন্ত্রিত দামের কারণে অনেক অত্যাবশ্যকীয় ওষুধ উৎপাদন অলাভজনক হয়ে পড়েছে।

২০২৬ সালের আগস্টে প্রথম আলোর আরেকটি প্রতিবেদনে উঠে আসে, গ্যাসসংকটের কারণে এসিআইর বিভিন্ন কারখানায় উৎপাদন কমে গেছে। অন্যদিকে, স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালসকে পাবনা ও কালিয়াকৈরের কারখানা চালু রাখতে ডিজেলের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।

এগুলো কোনো পূর্ণাঙ্গ পরিসংখ্যান নয়। এমনকি উল্লিখিত অগ্নিকাণ্ডের সব ঘটনায় উৎপাদন বন্ধ হয়নি এবং বন্ধ পাওয়া কারখানাগুলোর সব কটি গত দুই বছরের মধ্যেই বন্ধ হয়েছে, এমনটিও নিশ্চিত নয়। তবু এসব ঘটনা থেকে বাংলাদেশের ওষুধশিল্পের ওপর ক্রমবর্ধমান চাপ ও সংকটের একটি চিত্র পাওয়া যায়।

সংবাদমাধ্যমের বিভিন্ন প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশের আমদানি বেড়েছে কয়েকগুণ, অন্যদিকে রপ্তানি কমেছে আশংকাজনকভাবে।

এমন পরিস্থিতিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কছাড়ের সংবাদ নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, দেশের উৎপাদনব্যবস্থা যখন জ্বালানিসংকট, কাঁচামালের উচ্চমূল্য, আর্থিক অনিশ্চয়তা ও বিনিয়োগের স্থবিরতায় বিপর্যস্ত, তখন শুধু শুল্কছাড় পেয়ে কতটা রপ্তানি বাড়ানো সম্ভব?

যে বাণিজ্যচুক্তিকে ইউনুস সরকার সাফল্য হিসেবে তুলে ধরেছিল, তার প্রকৃত অর্থনৈতিক সুবিধা, দীর্ঘমেয়াদি দায়বদ্ধতা এবং দেশীয় শিল্পের ওপর নেতিবাচক প্রভাব এখন দৃশ্যমান।

এবার দেখা যাক, বাংলাদেশের অর্থনীতি নিয়ে আইএমএফের পূর্বাভাস কী বলছে।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি নেমে আসতে পারে মাত্র ৩ দশমিক ২ শতাংশে। অন্যদিকে, বার্ষিক গড় মূল্যস্ফীতি হতে পারে ১০ দশমিক ৯ শতাংশ।

উদ্বেগের বিষয় হলো, আগামী কয়েক বছরেও অর্থনীতির শক্তিশালী পুনরুদ্ধারের আশাব্যঞ্জক চিত্র পাওয়া যাচ্ছে না।
উল্লিখিত পূর্বাভাস অনুযায়ী—

* ২০২৭–২৮ অর্থবছর: জিডিপি প্রবৃদ্ধি ২ দশমিক ২ শতাংশ।
* ২০২৮–২৯ অর্থবছর: জিডিপি প্রবৃদ্ধি ২ দশমিক ৮ শতাংশ।
* ২০২৯–৩০ অর্থবছর: জিডিপি প্রবৃদ্ধি ২ দশমিক ৯ শতাংশ।
* ২০৩০–৩১ অর্থবছর: জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৩ শতাংশ।

অর্থাৎ, এই পূর্বাভাস বাস্তবায়িত হলে আগামী কয়েক বছরেও বাংলাদেশের অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য গতিশীলতা ফিরে আসার সম্ভাবনা নেই।

যে দেশ একসময় ৮ শতাংশের কাছাকাছি জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছিল, সেই দেশের জন্য এমন পূর্বাভাস অত্যন্ত উদ্বেগজনক।

একটু ভাবুন তো, বিনিয়োগকারীরা কেন বাংলাদেশ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন?

একটি দেশের অর্থনীতি শুধু রাজনৈতিক বক্তৃতা, বিদেশি চুক্তি কিংবা বিনিয়োগ সম্মেলনের ফটোসেশনের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে না। বিনিয়োগের জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, আইনের শাসন, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ, নীতিগত ধারাবাহিকতা, নিরাপদ ব্যবসায়িক পরিবেশ এবং দীর্ঘমেয়াদি আস্থা। কী ‘এমন’ ঘটেছে গত দুই বছরে যে বিনিয়োগকারীরা এভাবে আস্থা হারাচ্ছে বাংলাদেশের উপর?

যে দেশে শিল্পকারখানা জ্বালানিসংকটে উৎপাদন কমাতে বাধ্য হয়, যেখানে ব্যবসায়ীরা ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তায় ভোগেন এবং যেখানে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়, সেখানে নতুন বিনিয়োগ আসবে কীভাবে?

একটি দেশ যখন নৈরাজ্য, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও দুর্বল শাসনব্যবস্থার কবলে পড়ে, তখন দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীরা কেন সেখানে নিজেদের পুঁজি ঝুঁকিতে ফেলবেন?

বাংলাদেশের অর্থনীতির সংকটকে কেবল বৈশ্বিক পরিস্থিতির অজুহাত দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। সরকারের নীতি, সিদ্ধান্ত, জ্বালানি ব্যবস্থাপনা, শিল্পবান্ধব পরিবেশ এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষার সক্ষমতাকেও প্রশ্নের মুখে আনতে হবে।

এবার নিজেকেই প্রশ্ন করুন—

যে দেশে বিদ্যমান শিল্পকারখানাগুলোই টিকে থাকার সংগ্রাম করছে, সেখানে নতুন বিনিয়োগকারীরা কোন ভরসায় আসবেন?

আর দেশের উৎপাদনব্যবস্থাকে শক্তিশালী না করে শুধু বিদেশি বাণিজ্যচুক্তির সাফল্য প্রচার করে বাংলাদেশকে কত দূর এগিয়ে নেওয়া সম্ভব? নিজেকে আরও প্রশ্ন করুন, বিগত ৩৮ বছরের মধ্যে জিডিপি প্রবৃদ্ধি সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় ফেলার জন্য আপনার দায় কতটুকু?

সংবাদটি শেয়ার করুন

আরও পড়ুন