ব্যাটিং ও কিপিং—দুই বিভাগেই লিটন দাসের কীর্তি

অথর
কুষ্টিয়া অনুসন্ধান নিউজ ডেক্স :   বাংলাদেশ
প্রকাশিত :13 October 2026, 5:31 PM | নিউজটি পড়া হয়েছে : 9 বার
ব্যাটিং ও কিপিং—দুই বিভাগেই লিটন দাসের কীর্তি

লিটন দাস কেবল হাসছিলেন। নিজের ভাগ্যকে বোধহয় নিজেই বিশ্বাস করতে পারছিলেন না!

১৪ ও ২৬ রানে ক্যাচ মিসের পর ৪৬ রানে বেঁচে যান রানআউটের সুযোগ থেকে। ভাগ্যলক্ষ্মী যেন আরও একবার তাঁর ওপর প্রসন্ন হলেন ৬৭ রানের মাথায়। উইকেটের পেছনে ক্যাচ হলেও আম্পায়ার আউট দেননি, আর আফগানিস্তানের হাতেও ছিল না কোনো রিভিউ।
এই একের পর এক পাওয়া সুযোগকে কাজে লাগিয়ে আফগান বোলারদের ওপর রীতিমতো তাণ্ডব চালালেন লিটন। স্বভাবসুলভ নান্দনিক শট খেলে ৮৭.১৭ স্ট্রাইক রেটে তুলে নিলেন এক ঝড়ো সেঞ্চুরি, যাতে ছিল ১৪টি চারের মার।

দ্বিতীয় ইনিংসে ৭ উইকেটে ৩৭২ রান তুলে বাংলাদেশ ইনিংস ঘোষণা করার পর, ৪৭৯ রানের বিশাল লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে চতুর্থ দিন শেষে ৩ উইকেটে ১৩২ রান তুলেছে আফগানিস্তান। প্রথম ইনিংসের সেঞ্চুরিয়ান রহমত শাহ এবারও ফিফটি (৫১) করলেও ইবাদত হোসেন তুলে নিয়েছেন ২টি গুরুত্বপূর্ণ উইকেট।
এটি লিটনের টেস্ট ক্যারিয়ারের সপ্তম শতক, আর বিশেষজ্ঞ উইকেটকিপার হিসেবে ষষ্ঠ। এর মাধ্যমে বাংলাদেশের পক্ষে উইকেটকিপার-ব্যাটার হিসেবে সবচেয়ে বেশি সেঞ্চুরির তালিকায় মুশফিকুর রহিমকে ছুঁয়ে ফেললেন তিনি।

মুশফিক ও লিটন ছাড়া বাংলাদেশের পক্ষে উইকেটকিপার হিসেবে টেস্ট সেঞ্চুরি আছে কেবল খালেদ মাসুদের। তবে ২০১৯ সালের পর থেকে আর উইকেটের পেছনে গ্লাভস হাতে নামেন না মুশফিক, যিনি এই ম্যাচের একই ইনিংসে খেলেছেন ৮১ রানের চমৎকার ইনিংস।
ব্যাটিংয়ের পাশাপাশি কিপিংয়েও গড়েন ইতিহাস। রহমত শাহর ক্যাচটি গ্লাভসবন্দী করে এক ম্যাচে ৮টি ডিসমিসালের রেকর্ড গড়েন লিটন। এর মাধ্যমে এক টেস্টে বাংলাদেশি উইকেটকিপার হিসেবে সর্বোচ্চ ডিসমিসালের খালেদ মাসুদের রেকর্ডটি নিজের করে নেন তিনি।

আন্তর্জাতিক টেস্ট ইতিহাসেও লিটন গড়েছেন নতুন কীর্তি। সাউথ আফ্রিকার ডেনিস লিন্ডসির (১৯৬৬ সালে জোহানেসবার্গে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে) পর বিশ্বের দ্বিতীয় উইকেটকিপার হিসেবে এক টেস্টে দুটি ৫০+ রান ও ৮টি ডিসমিসালের বিরল ডাবল অর্জন করলেন তিনি।
৩১ বছর বয়সী এই ক্রিকেটার বেশ কিছু দিন ধরেই উইকেটের পেছনে দুর্দান্ত ফর্মে আছেন, তবে টেস্ট ব্যাটিংয়ে ধারাবাহিকার অভাব ছিল স্পষ্ট।

অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে বাংলাদেশ ১-১ ব্যবধানে ঐতিহাসিক সিরিজ ড্র করলেও লিটনের সফরটা গিয়েছে বিষাদময়। যদিও এর আগের সিলেট টেস্টে পাকিস্তানের বিপক্ষে তিনি সেঞ্চুরি ও ফিফটি পেয়েছিলেন।

ইতিহাসের মাত্র ষষ্ঠ এবং বাংলাদেশের প্রথম ব্যাটার হিসেবে শীর্ষ ছয়ে ব্যাট করে এক সিরিজে অন্তত তিন ইনিংসে কোনো রান না করার তেতো স্বাদ পান তিনি। একই সঙ্গে প্রথম ইনিংসে পেয়ার (দুই ইনিংসেই শূন্য) পেয়েছিলেন, যা ২০২২ সালে তামিম ইকবালের পর কোনো বাংলাদেশি শীর্ষ সারির ব্যাটারের ক্ষেত্রে প্রথম।
তা ছাড়া বাংলাদেশের ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টি অধিনায়ক হিসেবে এশিয়ান গেমসে পদক জয়ে ব্যর্থ হওয়ায় সফরকারী সাংবাদিকদের কড়া প্রশ্নের মুখেও পড়তে হয়েছিল তাঁকে।

সব চাপ কাটিয়ে আবু ধাবীর ব্যাটিংবান্ধব উইকেট লিটনের জন্য নিয়ে আসে স্বস্তির হাওয়া।

প্রথম ইনিংসে দলের ব্যাটিং বিপর্যয়ের মাঝে ক্রিজে এসে মিরাজের সঙ্গে ৫০ রান যোগ করে নিজেও দেখা পান ফিফটির। তবে মোহাম্মদ সালীমের খাটো লেন্থের বলে শট খেলতে গিয়ে ইয়ামিন আহমাদজাইয়ের দারুণ এক ক্যাচে থামে তাঁর ইনিংস।

তৃতীয় দিন বিকেলে বাংলাদেশ যখন ভালো অবস্থান থেকে আবারও ভেঙে পড়ছিল, তখন উইকেটে আসেন লিটন।
দিনের শুরুটা ৫ রানে করার পর কায়েস আহমেদের বলে চার মেরে রানের খাতা খোলেন লিটন। টাইমিং আর নিখুঁত শট নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি ভাগ্যের সাহায্যও পান পুরোদমে।

লাঞ্চের পর ৮১ রান নিয়ে খেলা শুরু করে কায়েসকে সেই একই শটে সীমানা পার করে ক্যারিয়ারের সপ্তম টেস্ট সেঞ্চুরি স্পর্শ করেন। সেঞ্চুরি পূর্ণ করতে তিনি খরচ করেন ১১৫ বল।

সপ্তম উইকেটে মেহেদী হাসান মিরাজের সঙ্গে গড়েন ১৪৯ রানের বড় জুটি। অবিজেয় ৫২ রান করেন মিরাজ। সপ্তম বা তার নিচের উইকেটে জুটিতে শতক ছোঁয়ার ক্ষেত্রে এটি এই জুটির তৃতীয় সেঞ্চুরি স্ট্যান্ড, যা যৌথভাবে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ।

টেস্ট ক্যারিয়ারে এ নিয়ে চতুর্থবারের মতো উভয় ইনিংসে ফিফটি বা তার বেশি রান করলেন লিটন। আগের তিনবারের মতোই এবারও এক ইনিংসকে রূপ দেন শতকে।

নিজের ব্যাটিং ও কিপিং নিয়ে লিটন বলেন, ‘উইকেটের পেছনে দাঁড়িয়ে থাকাটা আমাকে সাহায্য করে, কারণ সেখান থেকে পিচের আচরণ খুব ভালোভাবে বোঝা যায়। এটা পরে ব্যাটিংয়ে অনেক কাজে দেয়।’

শতক পূর্ণ করার পরপরই আউট হন লিটন, আর বাংলাদেশও তৎক্ষণাৎ ইনিংস ঘোষণা করে। তবে ততক্ষণে ভাগ্যের সহায়তা আর নিজের ব্যাটের কারিশমায় আফগানিস্তানকে জয়ের জন্য এক পর্বতসমান লক্ষ্য এনে দিয়েছেন তিনি।

সংবাদটি শেয়ার করুন

আরও পড়ুন