লাখ লাখ টাকা চাঁদা-অবৈধ ফি’র চক্রে জিম্মি বাংলাদেশি শ্রমিকরা: জানালেন সিঙ্গাপুরের সাবেক প্রেসিডেন্ট প্রার্থী

অথর
কুষ্টিয়া অনুসন্ধান নিউজ ডেক্স :   বাংলাদেশ
প্রকাশিত :20 October 2026, 5:44 AM | নিউজটি পড়া হয়েছে : 1 বার
লাখ লাখ টাকা চাঁদা-অবৈধ ফি’র চক্রে জিম্মি বাংলাদেশি শ্রমিকরা: জানালেন সিঙ্গাপুরের সাবেক প্রেসিডেন্ট প্রার্থী

সিঙ্গাপুরে নির্মাণ ও সামুদ্রিক খাতে কাজ পেতে বাংলাদেশি অভিবাসী শ্রমিকদের বিপুল অঙ্কের অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। চাকরির প্রস্তাব পেতে এজেন্টকে লাখ লাখ টাকা দেওয়া, দক্ষতার সনদ সংগ্রহ, প্রশিক্ষণ, মেডিকেল পরীক্ষা ও অন্যান্য নথিপত্রের খরচ মেটাতে গিয়ে অনেক শ্রমিককে বিদেশে যাওয়ার আগেই ঋণের বোঝা নিতে হচ্ছে বলে দাবি করেছেন সিঙ্গাপুরের ব্যবসায়ী তান কিন লিয়ান।

তান কিন লিয়ান সিঙ্গাপুরের একজন ব্যবসায়ী ও সাবেক বিমা নির্বাহী। তিনি ১৯৭৭ থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত টানা ৩০ বছর দেশটির শ্রমিক আন্দোলনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সমবায়ভিত্তিক বিমা প্রতিষ্ঠান NTUC Income-এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (CEO) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ২০১১ ও ২০২৩ সালে সিঙ্গাপুরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন।

নিজের ফেসবুক পোস্টে এক বাংলাদেশি বিদেশগামী শ্রমিকের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য তুলে ধরে তিনি সিঙ্গাপুরের বিদেশি শ্রমিক নিয়োগব্যবস্থায় মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য, অতিরিক্ত ফি আদায় এবং আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ করেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, নিয়োগের সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন পক্ষের কমিশন ও অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের কারণে শ্রমিকদের ওপর আর্থিক চাপ বাড়ছে।

তান কিন লিয়ানের উল্লেখ করা তথ্য মতে চাকরির প্রস্তাব পেতে এজেন্ট ফি দাঁড়ায় প্রায় ৭ লাখ থেকে ১০ লাখ টাকা। দক্ষতার সনদ সংগ্রহে ব্যয়ের অভিযোগ প্রায় ১৬ লাখ টাকা। এর বাইরে চাকরির ব্যবস্থা ও সিঙ্গাপুরে যাওয়ার জন্য আরও প্রায় ৫ লাখ থেকে ৬ লাখ টাকা দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

চাকরির প্রস্তাব পেতেই ৭–১০ লাখ টাকা
তান কিন লিয়ানের পোস্ট অনুযায়ী, সিঙ্গাপুরের কোম্পানিগুলো বাংলাদেশে গিয়ে প্রার্থী বাছাই ও সাক্ষাৎকার নিলেও চাকরির প্রস্তাব পাওয়ার জন্য প্রত্যেক প্রার্থীকে নিয়োগ এজেন্টদের ৬ হাজার থেকে ৮ হাজার মার্কিন ডলার দিতে হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ প্রায় ৭ লাখ ৪০ হাজার থেকে ৯ লাখ ৮৮ হাজার টাকা।

এর বাইরে মেডিকেল পরীক্ষা, বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ, দক্ষতার সনদ এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহের খরচও শ্রমিকদের বহন করতে হচ্ছে বলে দাবি করেছেন তিনি।

বিশেষ করে নির্মাণ খাতে কাজ করতে আগ্রহী শ্রমিকদের দক্ষতার সনদ সংগ্রহের ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তান কিন লিয়ান। তাঁর দাবি, বাংলাদেশে নির্মাণশ্রমিকদের সিঙ্গাপুরের সংশ্লিষ্ট দক্ষতা যাচাই ও সনদপ্রাপ্তির প্রক্রিয়ায় প্রায় ১৩ হাজার মার্কিন ডলার, অর্থাৎ ১৬ লাখ টাকা পর্যন্ত ব্যয় করতে হচ্ছে।

তিনি আরও দাবি করেন, সনদ প্রদানকারী প্রশিক্ষণকেন্দ্রের প্রকৃত প্রশিক্ষণ ও উপকরণ ব্যয়ের তুলনায় আদায় করা অর্থ অনেক বেশি। তাঁর পোস্টে একটি প্রশিক্ষণকেন্দ্রের প্রকৃত ব্যয় প্রায় ১ হাজার মার্কিন ডলার বা ১ লাখ ২৩ হাজার টাকা বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

এই বর্ণনা সত্য হলে, একজন শ্রমিককে শুধু সনদ, চাকরির ব্যবস্থা ও যাত্রার খরচ মিলিয়েই প্রায় ২১ লাখ থেকে ২২ লাখ টাকা ব্যয় করতে হতে পারে। এর বাইরে অন্যান্য ব্যক্তিগত খরচও রয়েছে।

সিঙ্গাপুরে কিছু প্রকল্প ব্যবস্থাপকও নিয়োগ এজেন্সির কাছ থেকে কমিশনের অংশ পান বলে তাঁর পোস্টে অভিযোগ করা হয়েছে। তবে এ দাবির পক্ষে তিনি কোনো নথি বা নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নাম প্রকাশ করেননি।

সিঙ্গাপুরের জনশক্তি মন্ত্রণালয়ের নিয়ম অনুযায়ী, দেশটিতে নিয়োগ এজেন্সির ফি আদায়ের ওপর সীমা রয়েছে। সাধারণভাবে, কাজের অনুমতিপত্র বা চুক্তির মেয়াদের প্রতি বছরের জন্য এক মাসের নির্ধারিত বেতনের বেশি ফি নেওয়া যায় না; সর্বোচ্চ সীমা দুই মাসের বেতন।

তবে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে বিদেশি এজেন্ট বা মধ্যস্বত্বভোগীদের মাধ্যমে অর্থ আদায়ের অভিযোগ মোকাবিলা করা জটিল। সিঙ্গাপুরের জনশক্তি মন্ত্রণালয় ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে জানিয়েছিল, শ্রমিকদের নিজ দেশে বিদেশি এজেন্টদের নেওয়া অর্থের ওপর সিঙ্গাপুরের সরাসরি আইনি এখতিয়ার নেই।

প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন, এজেন্টদের কাছে জিম্মি শ্রমিকরা
বিদেশে কর্মসংস্থানের নামে বাংলাদেশি শ্রমিকদের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা আদায়, অতিরিক্ত নিয়োগ ফি, দক্ষতার সনদ সংগ্রহে অস্বাভাবিক ব্যয় এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্যের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। অথচ প্রবাসী শ্রমিকদের দুর্ভোগ লাঘব, নিয়োগ ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং এজেন্টদের কাছে জিম্মি হয়ে সর্বস্বান্ত হওয়া থেকে তাঁদের রক্ষায় প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের কার্যকর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।

বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি, বৈধ অভিবাসন নিশ্চিত করা এবং প্রবাসী শ্রমিকদের অধিকার ও স্বার্থ রক্ষার দায়িত্ব যে মন্ত্রণালয়ের, সেই মন্ত্রণালয়ের বিদ্যমান তদারকি ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা শ্রমিকদের প্রতিনিয়ত প্রতারণার হাত থেকে কতটা সুরক্ষা দিতে পারছে, তা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।

অনুমোদিত রিক্রুটিং এজেন্সির তালিকা প্রকাশ, অনলাইন নিবন্ধন এবং প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা থাকলেও বাস্তবে একজন শ্রমিককে বিদেশে যাওয়ার আগে কত টাকা দিতে হচ্ছে, সেই অর্থের কতটা বৈধ এবং অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে—এসব প্রশ্নের সন্তোষজনক উত্তর জরুরি।

সিঙ্গাপুরে বাংলাদেশি শ্রমিকদের নিয়োগ ব্যয় নিয়ে তান কিন লিয়ানের সাম্প্রতিক অভিযোগ এই দুর্বলতাগুলোকে নতুন করে সামনে এনেছে। চাকরির প্রস্তাব, দক্ষতার সনদ ও বিদেশযাত্রার ব্যবস্থা করতে গিয়ে শ্রমিকদের কাছ থেকে বিপুল অর্থ আদায়ের অভিযোগ সত্য হলে, তা শুধু অসাধু এজেন্টদের দায় নয়; নিয়োগপ্রক্রিয়ার তদারকি ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ভূমিকা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

প্রশ্ন উঠছে, বিদেশগামী শ্রমিকদের জন্য নির্ধারিত ও স্বচ্ছ ব্যয়ের তালিকা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে কি না, প্রশিক্ষণকেন্দ্র ও নিয়োগ এজেন্সির আর্থিক কার্যক্রম নিয়মিত নিরীক্ষা করা হচ্ছে কি না এবং প্রতারণার শিকার শ্রমিকদের অভিযোগের দ্রুত নিষ্পত্তি হচ্ছে কি না। কোনো অনিয়মের অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তির বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, তারও স্বচ্ছ হিসাব থাকা দরকার।

বিদেশে কর্মসংস্থান বাংলাদেশের অর্থনীতি ও লাখ লাখ পরিবারের জীবিকার সঙ্গে সরাসরি জড়িত। অথচ বিদেশে যাওয়ার জন্য শ্রমিকদের ঋণ করতে হলে এবং প্রতারণার শিকার হওয়ার আশঙ্কা নিয়ে দেশ ছাড়তে হলে সেই কর্মসংস্থানের সুফল প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। তাই প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের কাছে এখন সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা—প্রবাসী শ্রমিকদের দুর্ভোগ লাঘবে দৃশ্যমান ও পরিমাপযোগ্য পদক্ষেপ নেওয়া, নিয়োগ এজেন্টদের অনিয়ম কঠোরভাবে দমন করা এবং বিদেশগামী শ্রমিকদের অর্থ ও অধিকার সুরক্ষায় কার্যকর জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা করা।

সিঙ্গাপুরে কাজের সুযোগ বাংলাদেশের বহু পরিবারের কাছে অর্থনৈতিক উন্নতির পথ। কিন্তু বিদেশে যাওয়ার আগেই যদি একজন শ্রমিককে ২০ লাখ টাকার বেশি ব্যয় করতে হয়, তাহলে বিদেশে কাজ করে উপার্জিত অর্থের সুফল পাওয়া কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

তান কিন লিয়ানের পোস্টে উত্থাপিত অভিযোগগুলো তাই শুধু নিয়োগ এজেন্টদের ভূমিকা নয়, দক্ষতা যাচাই, প্রশিক্ষণ ফি, নিয়োগকর্তার দায়বদ্ধতা এবং দুই দেশের সরকারি তদারকির কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন